অনেকে আমাকে একটা প্রশ্ন করেন…
এত লেখালিখি কেন করেন? এতে আপনার কী লাভ?
আমি সাধারণত শুধু হেসে ফেলি।
মুখ ফুটে কিছুই বলি না।
কারণ…
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না।
বরং একটা ছোট্ট গল্প বলি।
হয়তো সেই গল্পটাই আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে।
প্রায়ই এমন হয়…
ব্রহ্মমুহূর্তে…
ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ…
কোনো অ্যালার্ম ছাড়াই আমার ঘুম ভেঙে যায়।
আজও বুঝতে পারি না কেন।
কিন্তু ঘুম ভাঙার পর…
আমার মাথার ভেতর যেন একের পর এক নতুন ভাবনা আসতে শুরু করে।
কোনোটা একটা গল্প…
কোনোটা একটা বইয়ের অধ্যায়…
কোনোটা আবার ইউটিউব ভিডিওর নতুন আইডিয়া।
তখন আর বিছানায় পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না।
আমি উঠে বসি।
লিখতে শুরু করি।
একটা লাইন লিখি…
আবার কেটে দিই।
একটা উদাহরণ খুঁজি…
মনে হয়, না… এটা ঠিক হলো না।
আবার নতুন করে শুরু করি।
কখনও কখনও…
একটা স্ক্রিপ্ট শেষ করতে তিন-চার দিন কেটে যায়।
কারণ আমি শুধু লিখি না…
আমি চেষ্টা করি…
একটা ভাবনাকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার, সহজ আর প্রাণবন্ত করে তুলতে।
তারপর…
হঠাৎ একদিন…
সবকিছু যেন নিজের জায়গায় বসে যায়।
এতদিন ধরে মাথার ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট ভাবনাগুলো…
হঠাৎ যেন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
যেন এতদিন আলাদা আলাদা থাকা বিন্দুগুলো…
হঠাৎ এক সরল রেখায় মিলিয়ে গেল।
যেন অনেকগুলো ছড়িয়ে থাকা মুক্তো…
একটি সুতোয় গাঁথা পড়ল।
যে ভাবনাটা এতদিন শুধু আমার কল্পনার ভেতর ছিল…
সে ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে…
মনে হয়…
আমি কিছু লিখিনি।
বরং…
আমি নতুন কিছু সৃষ্টি করেছি।
সেই মুহূর্তটার আনন্দ…
সত্যি বলছি…
ভাষায় বোঝানো কঠিন।
আর ঠিক তখনই…
আমার মনে পড়ে যায় কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর লাইনগুলো—
“আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে,
মোর টগবগিয়ে খুন হাসে।”বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি…
এগুলো শুধু কবিতার লাইন নয়।
এটা একজন স্রষ্টার মনের ভাষা।
এটা সৃষ্টির মনস্তত্ত্ব-(psychology or mindset)
আজ বুঝি…
আমি লিখি শুধু মানুষ পড়বে বলে নয়।
আমি লিখি…
কারণ সৃষ্টি করার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দ আছে।
একটা নতুন ভাবনাকে…
শূন্য থেকে ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ দেওয়ার আনন্দ।
লেখা আমার কাছে কোনো পেশা নয়।
কোনো বাধ্যবাধকতাও নয়।
এটা আমার কাছে…
সৃষ্টির আনন্দ।
আর একটা কথা…
এই অনুভূতিটা…
আমার লেখা পড়ে আপনি পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না।
কোনো বই পড়েও না।
কোনো ভিডিও দেখেও না।
কারণ…
সৃষ্টি করার আনন্দ…
শুধু দেখে শেখা যায় না।
এটা অনুভব করতে হয়।
নিজের হাতে।
সেটা কোড লেখা হতে পারে।
একটা গান হতে পারে।
একটা কবিতা।
একটা ছবি।
একটা বই।
একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
একটি ব্যবসার নতুন ধারণা।
একটি নতুন ডিজাইন।
অথবা এমন একটি সমাধান…
যা আগে কেউ ভাবেনি।
মাধ্যমটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
গুরুত্বপূর্ণ হলো…
আপনি কি শূন্য থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করলেন?
যেদিন আপনি এমন কিছু তৈরি করবেন…
যা আগে পৃথিবীতে ছিল না…
সেদিন হয়তো…
হঠাৎ করেই নজরুলের সেই লাইনগুলোর গভীর অর্থ আপনার হৃদয়ে ধরা দেবে।
সেদিন আপনি বুঝবেন…
কেন তিনি লিখেছিলেন—
“আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে…”
আর হয়তো…
আপনিও একদিন নিজের অজান্তেই অনুভব করবেন—
“মোর মুখ হাসে…
মোর চোখ হাসে…
মোর টগবগিয়ে খুন হাসে।”
বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…