‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কীভাবে মুখস্থ করা যায়?
বন্ধুরা,
অনেক দিন ধরেই কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতাটা আমার ভীষণ ভালো লাগত।
যখনই ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠে এই কবিতাটি শুনতাম…
আমার সারা শরীরে যেন শিহরণ জেগে উঠত।
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত।
মনে হতো…
এ শুধু একটি কবিতা নয়…
এ যেন আগুনের বিস্ফোরণ।
তখন নিজের মনেই একটা স্বপ্ন দেখতাম…
“একদিন আমিও এই পুরো কবিতাটা না দেখে আবৃত্তি করব।”
সেই স্বপ্ন নিয়েই অনেকবার চেষ্টা করেছি।
দু’-চার দিন খুব উৎসাহ নিয়ে পড়েছি…
কিছু অংশ মনে থেকেছে…
তারপর আবার সব গুলিয়ে গেছে।
কয়েক দিন পর আবার নতুন করে শুরু করেছি…
আবার থেমে গেছি।
এভাবেই বহুবার চেষ্টা করেছি…
কিন্তু পুরো কবিতাটা আর আমার আয়ত্তে আসেনি।
তখন নিজের কাছেই একটা প্রশ্ন করতাম…
কেন?
এত বড়…
এত শক্তিশালী…
এত কঠিন…
এত রূপক, উপমা আর প্রতীকে ভরা আগুনঝরা একটা কবিতা…
মানুষ কীভাবে মনে রাখে?
ঠিক তখনই…
একদিন হঠাৎ…
ইউটিউবে আমার প্লেলিস্টে একটি ভিডিও চলে এল।
ভিডিওটি দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল…
এটার সঙ্গে আমার প্রশ্নের কোনো সম্পর্কই নেই।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই…
আমার মাথার ভেতরে যেন একটার পর একটা পুরনো উপলব্ধি জেগে উঠতে শুরু করল।
মনে পড়ে গেল বহু বছর আগে দেখা National Geographic-এর একটি ডকুমেন্টারি।
সেখানে দেখানো হচ্ছিল…
একটি সাপ…
ধীরে ধীরে কিভাবে একটি বড় ব্যাঙকে গিলে খাচ্ছে ,।
সেই দৃশ্যটা আমি আজও ভুলিনি।
তারপর মনে পড়ল…আরও একটি বিষয়।
Engagement Theory during a corporate training.
হঠাৎ করেই মনে হলো…
আরে!
সাপের সেই আচরণ…
আর মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে…
কী আশ্চর্য মিল!
সেই মুহূর্তে…
আমার একটা উপলব্ধি হলো…
সমস্যাটা হয়তো আমার মনে রাখার ক্ষমতায় ছিল না।
সমস্যাটা ছিল…
মনে রাখার পদ্ধতিতে।
আমি বুঝতে পারলাম…
আমি আমার মস্তিষ্ককে…
যেভাবে তথ্য গ্রহণ করতে ভালো লাগে…
সেভাবে তথ্য দিচ্ছিলাম না।
অর্থাৎ…
আমি আমার মস্তিষ্ককে…
সঠিকভাবে তথ্য খাওয়াচ্ছিলাম না।
আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হলো…
আমার জীবনের…
একটি সম্পূর্ণ নতুন যাত্রা।
“বিদ্রোহী” কবিতা তো আসলে ১২টি স্তবকের (stanzas) একটি বিশাল যাত্রা।
তাহলে আমি কেন…
একসঙ্গে পুরো ১২টি স্তবক মনে রাখার চেষ্টা করছি?
সেখানেই তো সমস্যার শুরু।
ফল কী হতো?
দু-একটি স্তবক ভালোই মনে থাকত…
তারপর…
এক স্তবক আরেক স্তবকের সঙ্গে মিশে যেত।
সবকিছু…
একেবারে ঘেঁটে ঘ হয়ে যেত।
সাপ কখনোই একসঙ্গে অনেকগুলো শিকার করে না।
আর একবারে…ব্যাঙকে গিলেও ফেলে না।
সে…সময় নিয়ে সেটাকে হজম করে…
তারপর পরের শিকারের দিকে যায়।
তাই…
সেদিন থেকেই আমি আমার কৌশলটা পুরো বদলে দিলাম।
আর পুরো কবিতা নয়।
শুধু…
একটি স্তবক।
One stanza at a time.
সেই একটি স্তবক পড়তাম…
বুঝতাম…
তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পটা খুঁজে বের করতাম…
তার সঙ্গে একটা Mindset জুড়ে দিতাম…
আর সেটাকে নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতাম।
যখন মনে হতো…
এই স্তবকটা এখন আমার মনের ভেতরে সত্যিই জায়গা করে নিয়েছে…
তখনই শুধু…
পরের স্তবকে এগিয়ে যেতাম।
আজকের Learning Psychology-তে…
এই ধারণাটার সঙ্গে মিল আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির—
Engagement Before Memorization.
অর্থাৎ…
মুখস্থ করার আগে…
বিষয়টার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হও।
কারণ…
যে তথ্যের সঙ্গে আমাদের কোনো আবেগ নেই…
কোনো গল্প নেই…
কোনো ব্যক্তিগত সংযোগ নেই…
সেই তথ্য…
খুব দ্রুত স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।
কিন্তু…
যে তথ্য…
আমাদের নিজের জীবনের অংশ হয়ে যায়…
তাকে আর আলাদা করে মনে রাখতে হয় না।
সে…
নিজেই মনে থেকে যায়।
আমার কাছে…
“বিদ্রোহী” কবিতা শেখার আসল মোড়টা…
ঠিক সেখানেই এসেছিল।
আমি আর কবিতাকে মুখস্থ করছিলাম না…
আমি কবিতার সঙ্গে…
একটা সম্পর্ক তৈরি করছিলাম।
তাহলে চলুন…
এবার একে একে দেখি…
কীভাবে “বিদ্রোহী” কবিতার প্রতিটি স্তবক…
আমাদের মানসিক বিকাশের…
এক একটি অসাধারণ ধাপকে তুলে ধরে।
এবার আসি…
প্রথম স্তবকে।
আমি যখন বারবার এই অংশটা পড়েছি…
একটা বিষয় আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আমার মনে হয়েছে…
প্রথম স্তবকটি…
আসলে একটাই কথা বলে—
Champion Mindset.
একবার সেই সময়টার কথা কল্পনা করুন।
ভারত তখন…
ব্রিটিশ শাসনের অধীনে।
বছরের পর বছর…
পরাধীনতা…
অপমান…
শোষণ…
আর সবচেয়ে বড় কথা…
মানসিক দাসত্ব।
শুধু দেশের স্বাধীনতাই কেড়ে নেওয়া হয়নি…
ধীরে ধীরে…
মানুষের নিজের ওপর বিশ্বাসটাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিলেন…
“ইংরেজদের হারানো অসম্ভব।”
“ওরা জন্মগতভাবেই আমাদের চেয়ে শক্তিশালী।”
“স্বাধীনতা…
সেটা আমাদের ভাগ্যে নেই।”
“আমরা কোনোদিন স্বাধীন হতে পারব না।”
এটাই তো…
পরাধীনতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
এটি শুধু…
মানুষের শরীরকে বন্দী করে না…
মানুষের Mindset-কেও বন্দী করে ফেলে।
আর ঠিক এখানেই…
আমি নজরুলের অসাধারণত্ব দেখি।
তিনি বুঝেছিলেন…
কোনো জাতিকে জাগাতে হলে…
প্রথমে তার হাতে অস্ত্র তুলে দিলেই হবে না।
প্রথমে…
তার মনের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা শক্তিটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
তাকে আবার…
নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শেখাতে হবে।
তাই দেখুন…
কবিতার একেবারে শুরুতেই…
বারবার ফিরে আসছে একটি শব্দ—
“আমি…”
“আমি…”
“আমি…”
প্রথমবার যখন এটা খেয়াল করলাম…
আমার মনে হলো…
এ তো শুধু কবিতা নয়।
এ যেন…
একজন মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন।
একজন মানুষ…
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে…
নিজেকেই বলছে—
আমি ভয় পাই না।
আমি মাথা নত করব না।
একদিন অত্যাচারীর মাথাই নত হবে।
আমি থামব না।
আমি অজেয়।
আমার ভেতরের শক্তিকেই… আজ আমি জাগিয়ে তুলেছি।
আজকের মনোবিজ্ঞানে…
এই বিষয়টিকে বলা হয়…
Positive Self-Talk…
অথবা…
Positive Affirmation।
অর্থাৎ…
আপনি প্রতিদিন…
নিজের সঙ্গে কী কথা বলছেন…
ধীরে ধীরে…
সেটাই আপনার বিশ্বাসে পরিণত হয়।
আর…
আপনার বিশ্বাসই…
আপনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
আপনার সিদ্ধান্ত…
আপনার আচরণকে বদলে দেয়।
আর…
আপনার আচরণই…
একসময় আপনার ভাগ্য গড়ে তোলে।
হয়তো সেই কারণেই…
নজরুল কবিতার শুরু করেছিলেন…
“আমি” দিয়ে।
কারণ…
যে মানুষ নিজের মনকে জয় করতে পারে…
তাকে হারানো…
পৃথিবীর কোনো শক্তির পক্ষেই সহজ নয়।
Watch the following video to understand the concept & its deep impact on us
কর্পোরেট জীবনে…
আমি বহু মানুষকে দেখেছি…
যোগ্যতার অভাবে নয়…
নিজের ওপর বিশ্বাসের অভাবে…
জীবনের বড় বড় সুযোগ হারিয়ে ফেলতে।
আবার…
এমন মানুষও দেখেছি…
যাদের শুরুটা ছিল একেবারে সাধারণ।
না ছিল বড় ডিগ্রি…
না ছিল বিশেষ পরিচয়…
না ছিল কোনো শক্তিশালী ব্যাকগ্রাউন্ড।
কিন্তু…
নিজের ওপর অটল বিশ্বাসের জোরে…
একদিন…
তাঁরাই অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন।
তখন আমার মনে হয়েছে…
নজরুল যেন ঠিক এই কথাটাই বলতে চাইছেন।
প্রথমে…
নিজের ভেতরের মানুষটাকে জাগাও।
প্রথমে…
নিজের মনকে বলো—
আমি পারি।
আমি পারব।
আমার মধ্যেও অসীম শক্তি আছে।
আজ আমরা এই বিষয়গুলোকে বলি…
Self-Belief…
Self-Confidence…
Self-Esteem…
কিন্তু…
আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো…
প্রায় একশো বছর আগেই…
নজরুল…
“বিদ্রোহী” কবিতার প্রথম স্তবকে…
একটি Champion Mindset-এর বীজ বপন করেছিলেন।
তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন…
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই…
জয় কিংবা পরাজয়…
প্রথমে নির্ধারিত হয়…
মানুষের মনের ভেতর।
কারণ…
যে মানুষ…
নিজের মনেই হেরে যায়…
সে বাইরের কোনো যুদ্ধ…
কোনোদিন জিততে পারে না।
কিন্তু…
যে মানুষ…
নিজের ভেতরের Champion-কে জাগিয়ে তুলতে পারে…
সে শুধু…
নিজের জীবনই বদলায় না…
প্রয়োজনে…
একটি পরিবারকে বদলে দেয়…
একটি প্রতিষ্ঠানকে বদলে দেয়…
একটি জাতিকে বদলে দেয়…
আর কখনো কখনো…
ইতিহাসও বদলে দেয়।
বল বীর —
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর —
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর —
আমি চির-উন্নত শির!
বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…