ঢোলকবি — যিনি Non-Veg কবিতা ও Parody-কে শিল্পের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন
বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচলিত নিয়মের বাইরে হেঁটে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করেছেন।
প্রথমে তাঁদের নিয়ে ,তাঁদের কাজ নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে।
সমালোচনা হয়েছে।
অনেকে তাঁদের কাজকে শিল্প বলতেও রাজি হননি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষগুলিই হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি।
আজ আমরা এমনই একজন মানুষের গল্প বলব।
যাঁকে অধিকাংশ মানুষ তাঁর আসল নামের চেয়ে ডাকনামেই বেশি চেনেন।
তাঁর নাম— ঢোলকবি।
অনেকেই তাঁকে বলেন প্যারোডির রাজা।
আবার কেউ বলেন বাংলার Non-Veg কবিতার সম্রাট।
কি ছিল তাঁর অবদান?
কিভাবে তিনি বাংলা কবিতার এক সম্পূর্ণ নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের পর্ব।
একজন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র কীভাবে বাংলা প্যারোডি কবিতা ও হাস্যরসাত্মক আবৃত্তির জগতে কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন, সেই গল্প যেমন বিস্ময়কর, তেমনি অনুপ্রেরণাদায়কও।
মজার বিষয় হলো, তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে যেন কোনো মিলই ছিল না তাঁর ভবিষ্যৎ কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পের।
একদিকে তিনি ছিলেন একজন Engineering Student।
অন্যদিকে তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল কবিতা, আবৃত্তি এবং বাংলা ভাষার প্রতি।
প্রথম দর্শনে এই দুই জগতকে সম্পূর্ণ বিপরীত বলেই মনে হয়।
একদিকে সূত্র, অঙ্ক, মেশিন এবং প্রযুক্তি।
অন্যদিকে ছন্দ, শব্দ, আবেগ এবং সাহিত্য।
কিন্তু এই আপাত-বৈপরীত্যই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
কলেজ জীবনের প্রথম দিকে, অন্যান্য নতুন ছাত্রদের মতো তিনিও র্যাগিংয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
সেই সময় তিনি একটি বিষয় খুব গভীরভাবে লক্ষ করেছিলেন।
যে ছাত্র অন্যদের হাসাতে পারে, কিংবা মুহূর্তের মধ্যে কিছু অভিনব ও মজার সৃষ্টি করতে পারে, তাকে সাধারণত সিনিয়ররাও আলাদা চোখে দেখেন।
সেখানেই তাঁর জীবনের প্রথম “Eureka Moment” আসে।
তিনি বুঝতে পারেন, শুধু পড়াশোনা নয়— সৃজনশীলতাও হতে পারে একটি শক্তিশালী অস্ত্র।
আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে বাধ্য করে এমন একজন কবি ও পারফর্মার হয়ে উঠতে, যিনি মুহূর্তের মধ্যে শ্রোতাদের মন বুঝে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী হাসি, মজা এবং বিনোদন সৃষ্টি করতে পারেন।
তিনি নিজের বুদ্ধি, রসবোধ এবং কবিতা আবৃত্তির দক্ষতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।
সিনিয়রদের সামনে তাৎক্ষণিক Veg Non কবিতা, প্যারোডি এবং অভিনব পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি খুব দ্রুত সবার নজর কেড়ে নেন।
যা প্রথমে ছিল র্যাগিং থেকে বাঁচার একটি উপায়, সেটাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয়।
আর সেই পরিচয়ই একদিন তাঁকে “ঢোলকবি” নামে বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
হয়তো তখন তিনি নিজেও জানতেন না—
কলেজের সেই র্যাগিং পর্বে জন্ম নেওয়া একটি ছোট্ট বুদ্ধি একদিন বাংলা প্যারোডি কবিতা ও হাস্যরসের জগতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
কিন্তু একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর জনপ্রিয়তায় নয়।
তাঁর পরিচয় লুকিয়ে থাকে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে।
আর সেই দিক থেকে বিচার করলে, ঢোলকবির সৃষ্টির জগৎ ছিল বিস্ময়করভাবে বৈচিত্র্যময়।
কবিতা, আবৃত্তি, গান, নাটক, প্যারোডি, হাস্যরস, সামাজিক ব্যঙ্গ— সবকিছুতেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ।
তিনি শুধুমাত্র নিজের লেখা নিয়েই কাজ করেননি।
বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন যুগের কবিদের সৃষ্টিকেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
সুকুমার রায়ের রসিকতা থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী দর্শন থেকে জীবনানন্দ দাশের কাব্যিক সৌন্দর্য—
সবকিছুর প্রতিই ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ।
তাঁর পরিবেশনায় আমরা দেখতে পাই—সুকুমার রায়ের কবিতা
- রামগড়ুরের ছানা
- সৎপাত্র
- ডানপিঠে ছেলে
- কাঠবুড়ো
- খুড়োর ফল
- হাত গণনা
- কাতুকুতু বুড়ো
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (Satyendra Nath Dutta)
- সহমরণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.
- দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
- কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি
সিপাহী বিদ্রোহ by সুকান্ত ভট্টাচার্য (Sukanta Bhattacharya)
✍️ কবি: জীবনানন্দ দাশ–
বনলতা সেন –
✍️ Artist: কাজী নজরুল ইসলাম (Kazi Nazrul Islam)
- আমি মিসিসিপি থেকে –আমি এক যাযাবর.
- বিদ্রোহী- বল বীর – বল উন্নত মম শির শির
রামের বিলাপ
লক্ষ্মীর পাঁচালি
বিxxর আক্ষেপ
নাটক ও যাত্রা:
- সূর্পণখা কান্ড
- রাম-লক্ষ্মণ বার্তালাপ ✅(রাম ও লক্ষ্মণের মধ্যে সংলাপ )
সংক্ষিপ্ত নাট্য:
- Raja Raniমধ্যে সংলাপ
- Raja Montrir মধ্যে সংলাপ
3️⃣গান
Rabindra Sangeet-রবীন্দ্রসঙ্গীত
- পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়
ধনধান্যে পুষ্পে ভরা by দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (Dwijendralal Roy)
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় গান।
- আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা”
- ধিতাং ধিতাং বোলে”
কিশোর কুমার
- সে যেন আমার কাছে আজও বসে আছে
- আধো আলো ছায়াতে-আজ মন ভোলাতে হবে বলো কার
- আমার পূজার ফুল |
মান্না দে – “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই”
শ্যামল মিত্র Shyamal Mitra ✅
- গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে
অঞ্জন দত্তের গান
- বসে আছি ইষ্টিশানে
- রঞ্জনা আমি আর আসব না
এক বৈশাখে দেখা হল দুজনার-. জষ্ঠিতে হল পরিচয়। আরতি মুখোপাধ্যায়
আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয় – ভূপেন হাজারিকা
সাধের লাউ❤ Sadher Lau❤ by Runa Laila
নচিকেতা চক্রবর্তী
- বৃদ্ধাশ্রম” -ছেলে আমার মস্ত
- সরকারি কর্মচারী-বারোটায় অফিস আসি দুটোয় টিফিন
Bangla Band
Fossils-Bangla
- এতটা পথ পেরিয়ে এলাম”(Fossils-এর বিখ্যাত গান)
- জীবন চলছে না আর সোজাপথে (Fossils-এর বিখ্যাত গান)
বারান্দায় রোদ্দুর” (ভূমি-র জনপ্রিয় গান)
Miles
- নিঃস্ব করেছ আমায়
Poroshpathor Band
- আজি গানের তালে হৃদয় দোলে-Sujan –
3️⃣ বিজ্ঞাপন
জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন :Boroline Ad –
4️⃣ হাস্যরস:
মহালয়া: মহিষাসুরমর্দিনী –Mahalaya Reloaded by Birendra Krishna Bhadra
Famous বাংলা ব্যাকরণে, “সমাস”
এবং আরও অসংখ্য কালজয়ী রচনা।
তবে তিনি শুধুমাত্র কবিতার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
নাটক ও যাত্রার সংলাপ, রামায়ণভিত্তিক কৌতুকরসাত্মক পরিবেশনা, রাজা-মন্ত্রী কিংবা রাজা-রানীর সংলাপ— সবকিছুকেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র উপস্থাপনায় প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন।
গানের ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর অসাধারণ দখল।
রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক বাংলা গান,
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে মান্না দে,
কিশোর কুমার থেকে নচিকেতা,
ভূপেন হাজারিকা থেকে বাংলা ব্যান্ড—
তাঁর কণ্ঠে ও পরিবেশনায় যেন সব ধারাই নতুন রূপ পেত।
তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, বিজ্ঞাপন জগতও তাঁর কণ্ঠ ও উপস্থাপনার শক্তিকে কাজে লাগাতে আগ্রহী হয়েছিল।
আর হাস্যরস?
সেটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি কিংবা দৈনন্দিন জীবন—
সবকিছুকেই তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যাতে মানুষ একই সঙ্গে হাসত এবং ভাবত।
কিন্তু এখানেই তাঁর গল্প শেষ নয়।
তিনি শুধু তাঁর সময়ের একজন জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন না।
তিনি ছিলেন একজন দূরদ্রষ্টা।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতি যত দ্রুত হচ্ছে, ততই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের শিকড়, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়েও তাঁর ছিল গভীর উদ্বেগ।
তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যেমন আশীর্বাদ হতে পারে, তেমনি তার অন্ধ আসক্তি একটি প্রজন্মকে নিজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
তাই তিনি শুধু বিনোদন দিয়েই থেমে থাকেননি।
তিনি চেয়েছিলেন মানুষকে শিক্ষিত করতে।
সচেতন করতে।
চিন্তা করতে শেখাতে।
আর সেই লক্ষ্য থেকেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন এক যুগান্তকারী উদ্যোগ।
তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে এমন বিষয় সম্পর্কে সচেতন করা, যেগুলো নিয়ে সমাজে প্রচুর কৌতূহল থাকলেও সঠিক জ্ঞানের অভাব ছিল।
কিন্তু এটি শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না।
এটি ছিল একটি Movement of Awareness।
একটি এমন উদ্যোগ, যেখানে কোনো বিষয়কে লজ্জা, কুসংস্কার বা অজ্ঞতার আড়ালে রাখা হতো না।
বরং প্রতিটি বিষয়কে দেখা হতো সম্মান, যুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে।
তাঁর বিশ্বাস ছিল—
সঠিক শিক্ষা শুধু তথ্য দেয় না, মানুষের চিন্তাভাবনাকেও মুক্ত করে।
আর একজন সচেতন মানুষই পারে একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে।
সম্ভবত এ কারণেই তিনি শুধু একজন শিল্পী হিসেবে নন,
একজন শিক্ষাবিদ, সমাজসচেতন চিন্তক এবং পথপ্রদর্শক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তাহলে ঢোলকবির জীবন থেকে আমরা কী শিখলাম?
আমরা শিখলাম, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ডিগ্রি নয়, তার সৃজনশীলতা।
একজন Engineering Student নিজের রসবোধ, ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের মন বোঝার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারেন, তার জীবন্ত উদাহরণ হলেন ঢোলকবি।
তিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষকে হাসানো কোনো ছোট কাজ নয়।
বরং মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, দুঃখ ভুলিয়ে দেওয়া এবং আনন্দের মাধ্যমে সত্য কথা বলা— এটিও এক মহান শিল্প।
অনেকে কবিতার মাধ্যমে মানুষকে কাঁদিয়েছেন।
অনেকে ভাবিয়েছেন।
আর ঢোলকবি?
তিনি মানুষকে হাসিয়েছেন।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও লুকিয়ে ছিল তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, বুদ্ধিমত্তা এবং জীবনের গভীর উপলব্ধি।
আজ হয়তো তিনি আমাদের মাঝে নেই।
কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনও বেঁচে আছে।
তাঁর প্যারোডি, তাঁর কবিতা, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর রসবোধ— আজও নতুন প্রজন্মকে আনন্দ দেয়।
এটাই একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয়।
শিল্পী চলে যান।
কিন্তু তাঁর শিল্প বেঁচে থাকে।
আর সেই কারণেই ঢোলকবি শুধুমাত্র একজন কবি নন।
তিনি বাংলা প্যারোডি ও হাস্যরসের ইতিহাসে একটি প্রতিষ্ঠান।
একটি যুগ।
একটি কিংবদন্তি।
পরবর্তী পর্বে আমরা ফিরে আসব বাংলা সংস্কৃতির আরও এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বের গল্প নিয়ে।
ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকুন, হাসিখুশি থাকুন, এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকুন।
ধন্যবাদ।
(চলবে…)
বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…