Corporate Daduji

A Corporate Daduji’s Creation

Rash Behari Bose-Episode 3

মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে নিঃশব্দে।

কিন্তু পরে ইতিহাসের গতিপথই বদলে দেয়।

রাসবিহারী বসুর জীবনেও তেমনই একটি অধ্যায় শুরু হয়েছিল টোকিওর সোমা পরিবারে।

যে মানুষটি কয়েক বছর আগেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পরিকল্পনা করছিলেন,

যে মানুষটিকে ধরার জন্য গোটা ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর ছিল,

সেই মানুষটিই এখন একটি বিদেশি দেশের বাড়িতে আশ্রিত।

কিন্তু আশ্রিত হলেও তিনি পরাজিত ছিলেন না।

বরং ধীরে ধীরে তিনি জাপানি সমাজকে জানতে শুরু করেছিলেন।

শিখতে শুরু করেছিলেন জাপানি ভাষা।

বুঝতে শুরু করেছিলেন জাপানের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের মন।

এই সময়েই সোমা পরিবারের কন্যা তোশিকো সোমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর হতে শুরু করে।

তোশিকো ছিলেন শিক্ষিতা, আধুনিক এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন তরুণী।

রাসবিহারীর জীবনের সংগ্রাম, তাঁর দেশপ্রেম এবং তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

অন্যদিকে রাসবিহারীও উপলব্ধি করেছিলেন—

এই পরিবার শুধু তাঁকে আশ্রয় দেয়নি।

তাঁকে বিশ্বাস করেছে।

তাঁকে নিজের মানুষ বলে গ্রহণ করেছে।

ধীরে ধীরে সেই শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং বন্ধুত্ব পরিণত হলো ভালোবাসায়।

১৯১৮ সালে রাসবিহারী বসু ও তোশিকো সোমার বিবাহ সম্পন্ন হয়।

একজন বাঙালি বিপ্লবী।

একজন জাপানি তরুণী।

আজকের দিনে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হতে পারে।

কিন্তু একশো বছরেরও বেশি আগে এটি ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

এই বিবাহ শুধু দুটি মানুষের মিলন ছিল না।

এটি ছিল দুই সংস্কৃতির মিলন।

দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক।

আর এই সম্পর্ক রাসবিহারী বসুর জীবনকে নতুন শক্তি দিয়েছিল।

প্রথমবারের মতো তিনি অনুভব করলেন—

তিনি শুধু একজন পলাতক বিপ্লবী নন।

তিনি একটি পরিবারের অংশ।

একটি নতুন জীবনের অংশ।

কিন্তু ইতিহাস কখনও সহজ পথ বেছে নেয় না।

যখন মনে হচ্ছিল জীবনে কিছুটা স্থিরতা এসেছে,

তখনই আঘাত হানল নির্মম বাস্তবতা।

অত্যন্ত অল্প বয়সেই তোশিকো অসুস্থ হয়ে পড়েন।

দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

রাসবিহারী বসুর জীবনে এটি ছিল এক ভয়ঙ্কর আঘাত।

তিনি তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে হারিয়েছিলেন।

যে মানুষটি তাঁর সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল।

যে মানুষটি তাঁকে শুধু ভালোবাসেনি,

তাঁর স্বপ্নকেও ভালোবেসেছিল।

কিন্তু এখানেও রাসবিহারী ভেঙে পড়লেন না।

ব্যক্তিগত শোককে তিনি নিজের ভিতরে ধারণ করলেন।

আর নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করলেন সেই স্বপ্নের জন্য,

যে স্বপ্ন তাঁকে ভারত থেকে জাপানে নিয়ে এসেছিল।

ভারতের স্বাধীনতা।

এরই মধ্যে জাপানে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে।

তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন।

লেখালেখি করছেন।

ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নকে জাপানি সমাজের সামনে তুলে ধরছেন।

আর একটি আশ্চর্য বিষয় ঘটতে শুরু করল।

জাপানের মানুষ ধীরে ধীরে ভারতকে চিনতে শুরু করল রাসবিহারী বসুর মাধ্যমে।

তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর চিন্তাধারা এবং তাঁর সংগ্রাম অনেক জাপানির কাছে অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠল।

শুধু রাজনীতি নয়,

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি হয়ে উঠলেন ভারত ও জাপানের মধ্যে এক সেতুবন্ধন।

আর ঠিক এই সময়েই তাঁর মাথায় জন্ম নিতে শুরু করল আরও বড় একটি পরিকল্পনা।

তিনি বুঝেছিলেন—

একজন বিপ্লবী যতই সাহসী হোক,

একজন মানুষ একা একটি সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে পারে না।

প্রয়োজন একটি সংগঠন।

প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সমর্থন।

প্রয়োজন একটি সেনাবাহিনী।

সেই স্বপ্নই পরবর্তীকালে জন্ম দেবে ভারতীয় স্বাধীনতা লীগের।

সেই স্বপ্নই একদিন রূপ নেবে আজাদ হিন্দ ফৌজে।

কিন্তু তার আগে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

আসছে এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যাওয়ার সময়।

আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বাঙালি বিপ্লবী—

রাসবিহারী বসু।


১৯৩০-এর দশকের শেষভাগ।

পৃথিবী তখন আরেকটি মহাযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপে যুদ্ধের মেঘ জমছে।

এশিয়াতেও শুরু হয়েছে শক্তির নতুন লড়াই।

জাপান দ্রুত একটি সামরিক শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।

আর এই অস্থির সময়ে রাসবিহারী বসু একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে শুধুমাত্র বক্তৃতা বা আবেদন দিয়ে পরাজিত করা সম্ভব নয়।

প্রয়োজন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগানো।

প্রয়োজন এমন একটি সংগঠন, যা ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারবে।

প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি জাপানে আছেন।

এই সময়ে তিনি শুধু আত্মগোপন করেননি।

তিনি অপেক্ষা করেছেন।

মানুষ গড়েছেন।

সম্পর্ক তৈরি করেছেন।

এবং ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন।

এবার সেই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর সময় এসেছে।


১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এশিয়ায় নতুন মোড় নিল।

জাপান ব্রিটেন ও তার মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করল।

মালয়া, সিঙ্গাপুর, বার্মা—একটির পর একটি অঞ্চল যুদ্ধের আগুনে জড়িয়ে পড়ল।

এই যুদ্ধের মধ্যেই হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে জাপানিদের হাতে বন্দি হন।


রাসবিহারী বসু এই ঘটনায় এক নতুন সম্ভাবনা দেখতে পেলেন।

তিনি ভাবলেন—

এই সৈনিকরা তো ব্রিটিশদের জন্য নয়,

নিজেদের দেশের জন্যও যুদ্ধ করতে পারে।

যদি তাদের সামনে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন তুলে ধরা যায়,

তাহলে তারাই হতে পারে ভবিষ্যতের মুক্তিবাহিনী।

এই চিন্তা থেকেই শুরু হলো এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ।


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের একত্রিত করার কাজ।

সিঙ্গাপুর।

ব্যাংকক।

কুয়ালালামপুর।

রেঙ্গুন।

একটির পর একটি সভা।

একটির পর একটি বৈঠক।

একটাই বার্তা—

“ভারতের স্বাধীনতার জন্য বিদেশের মাটিতে বসেও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”


অবশেষে ১৯৪২ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে গঠিত হলো “ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ”।

এটি শুধু একটি সংগঠন ছিল না।

এটি ছিল বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের স্বাধীনতার মঞ্চ।

আর সেই সংগঠনের কেন্দ্রে ছিলেন রাসবিহারী বসু।

এক সময় যিনি একা পালিয়ে বেড়াতেন,

এখন তিনি হাজার হাজার ভারতীয়কে এক পতাকার নিচে একত্রিত করছেন।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তখনও পূরণ হয়নি।

তিনি চেয়েছিলেন একটি জাতীয় সেনাবাহিনী।

এমন একটি বাহিনী,

যারা ব্রিটিশ পতাকার নিচে নয়,

ভারতের পতাকার নিচে যুদ্ধ করবে।

এই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নিল একটি নতুন বাহিনী।

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি।

সংক্ষেপে—

আই.এন.এ।

যাকে আমরা আজ চিনি—

আজাদ হিন্দ ফৌজ নামে।


স্বপ্নটি নতুন ছিল না।

প্রকৃতপক্ষে ১৯১৫ সালের গদর বিদ্রোহের সময় থেকেই রাসবিহারী বসু ভারতীয় সেনাদের নিয়ে একটি সর্বভারতীয় সশস্ত্র বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

প্রায় তিন দশক পরে সেই স্বপ্ন আবার নতুন রূপে ফিরে এল।


কিন্তু একটি সমস্যা ছিল।

রাসবিহারী বসু ছিলেন অসাধারণ সংগঠক।

অসাধারণ কৌশলী।

অসাধারণ অনুপ্রেরণাদাতা।

কিন্তু তিনি জানতেন—

এই বিশাল আন্দোলনকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যেতে হলে দরকার এমন একজন নেতা,

যার নাম শুনে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় একসঙ্গে জেগে উঠবে।

যার ব্যক্তিত্ব সৈনিকদের অনুপ্রাণিত করবে।

যার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক স্তরেও গ্রহণযোগ্য হবে।

রাসবিহারী বসু তখন বৃদ্ধ হচ্ছেন।

স্বাস্থ্যও আগের মতো নেই।

কিন্তু তাঁর দৃষ্টি তখন আরও দূরে।

তিনি অপেক্ষা করছিলেন।

একজন মানুষের জন্য।

একজন নেতার জন্য।

যিনি এসে তাঁর স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলবেন।

আর কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে,

ইউরোপের মাটিতে,

আরেক বাঙালি বিপ্লবী তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নতুন পরিকল্পনা করছেন।

তাঁর নাম—

সুভাষচন্দ্র বসু।


মজার বিষয় হলো,

দুই বাঙালি বিপ্লবী হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও প্রায় একই স্বপ্ন দেখছিলেন।

রাসবিহারী বসু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় যুদ্ধবন্দী ও প্রবাসী ভারতীয়দের সংগঠিত করে একটি স্বাধীনতা বাহিনী গড়ার চেষ্টা করছিলেন।

অন্যদিকে নেতাজি ইউরোপে একই লক্ষ্যকে ভিন্ন পথে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করছিলেন।

জার্মানির বিভিন্ন বন্দিশিবিরে তখন হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক ছিলেন।

তাঁরা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতে গিয়ে জার্মান বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছিলেন।

তাদের নিয়েই গড়ে ওঠে “ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়ন” বা “ইন্ডিয়ান লিজিয়ন”।

একদিকে ইউরোপে নেতাজির ইন্ডিয়ান লিজিয়ন।

অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আজাদ হিন্দ ফৌজের ভিত্তি।

ইতিহাস যেন দুই ভিন্ন মহাদেশে একই স্বপ্নের দুটি অধ্যায় লিখছিল।

আর খুব শীঘ্রই সেই দুই ধারা ,দুই মহান বাঙালির পথ এক স্রোতে মিলিত হতে চলেছিল।


আর সেই সাক্ষাৎ শুধু দুই মানুষের সাক্ষাৎ ছিল না।

সেটি ছিল দুই যুগের মিলন।

দুই স্বপ্নের মিলন।

এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।


কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের আগে নেতাজিকে পার করতে হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য যাত্রাপথ।

একটি এমন যাত্রা, যা আজও বিশ্বের অন্যতম সাহসী রাজনৈতিক অভিযানের মধ্যে গণ্য করা হয়।


জার্মানি থেকে জাপান পৌঁছানো তখন প্রায় অসম্ভব।

চারদিকে যুদ্ধ।

সমুদ্রপথে মিত্রশক্তির কড়া নজরদারি।

আকাশপথ বিপজ্জনক।

তবুও নেতাজি সিদ্ধান্ত নিলেন—

তাঁকে যেতেই হবে।


১৯৪৩ সাল।

জার্মানির একটি সাবমেরিনে চেপে শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর সমুদ্রযাত্রা।

মাসের পর মাস সমুদ্রের গভীরে চলল সেই অভিযান।

তারপর ভারত মহাসাগরের মাঝখানে ঘটল এক অভূতপূর্ব ঘটনা।

সমুদ্রের বুকে দুই দেশের দুটি সাবমেরিনের মিলন।

একটি জার্মান।

অন্যটি জাপানি।

উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে নেতাজি জার্মান সাবমেরিন থেকে জাপানি সাবমেরিনে স্থানান্তরিত হলেন।

যেন কোনো হলিউড সিনেমার দৃশ্য।

কিন্তু এটি ছিল বাস্তব।

এবং সেই বাস্তবের কেন্দ্রে ছিলেন এক ভারতীয় বিপ্লবী।


অবশেষে বহু বাধা অতিক্রম করে নেতাজি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছালেন।

সেই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

সিঙ্গাপুর।

ব্যাংকক।

রেঙ্গুন।

কুয়ালালামপুর।

প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হলো।


আর রাসবিহারী বসু?

তিনি যেন বহুদিন ধরে এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

প্রায় তিন দশক আগে যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি ভারত ছেড়েছিলেন,

সেই স্বপ্ন আজ নতুন রূপ পেতে চলেছে।

তিনি জানতেন—

এই আন্দোলনকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন ক্যারিশম্যাটিক, সর্বজনগ্রাহ্য নেতার প্রয়োজন।

এবং তাঁর বিশ্বাস ছিল—

সুভাষচন্দ্র বসুই সেই মানুষ।


অবশেষে এলো সেই দিন।

দুই মহান বাঙালি মুখোমুখি হলেন।

একজন বয়সে প্রবীণ।

অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।

অসংখ্য ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আসা এক কিংবদন্তি।

অন্যজন যুবশক্তির প্রতীক।

অগ্নিময় বক্তা।

লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণা।

সেদিন রাসবিহারী বসু শুধু নেতাজিকে স্বাগত জানাননি।

তিনি তাঁর বহু বছরের সাধনা, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের উত্তরাধিকার নেতাজির হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

এটি ছিল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়।

এটি ছিল এক বিপ্লবের মশাল হস্তান্তর।

এক দৌড়বিদের হাত থেকে আরেক দৌড়বিদের হাতে ব্যাটন তুলে দেওয়ার মতো।


রাসবিহারী বসু বীজ বপন করেছিলেন।

মাটি প্রস্তুত করেছিলেন।

গাছটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

এবার সেই গাছকে মহীরুহে পরিণত করার দায়িত্ব নিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।


১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে নেতাজির হাতে অর্পণ করা হলো।

সেই মুহূর্তে হয়তো রাসবিহারী বসুর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল বহু বছরের স্মৃতি।

সুবলদহ গ্রামের সেই ছোট্ট ছেলে।

দেরাদুনের গোপন বিপ্লবী।

হার্ডিঞ্জ বোমা-কাণ্ড।

পলাতক জীবন।

জাপানে আত্মগোপন।

তোশিকোর ভালোবাসা।

দীর্ঘ সংগ্রাম।

আর আজ—

তাঁর স্বপ্ন নতুন ডানা পেল।


কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়ম আছে।

যারা ভিত্তি তৈরি করেন,

তাদের নাম অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে না।

সবাই নেতাজিকে মনে রাখে।

যথার্থভাবেই মনে রাখে।

কিন্তু সেই নেতাজির আগমনের বহু আগেই,

যে মানুষটি বিদেশের মাটিতে স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর স্বপ্ন দেখেছিলেন,

যে মানুষটি তিন দশক ধরে সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন,

তিনি ছিলেন—

রাসবিহারী বসু।

আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাসে নেতাজি ছিলেন তার জ্বলন্ত শিখা।

আর রাসবিহারী বসু ছিলেন সেই প্রদীপ,

যার আলো থেকে প্রথম সেই শিখার জন্ম হয়েছিল।


প্রতিটি মহান গল্পেরই একটি শেষ অধ্যায় থাকে।

কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মৃত্যু গল্পের সমাপ্তি নয়।

বরং কিংবদন্তির শুরু।

নেতাজির হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার পর রাসবিহারী বসু ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা সরে আসেন।

তাঁর শরীর তখন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়।

বয়স।

দীর্ঘ সংগ্রাম।

বছরের পর বছর মানসিক চাপ।

সবকিছুর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

কিন্তু তাঁর মন?

সেটি এখনও স্বাধীন ভারতের স্বপ্নেই বিভোর।

তিনি দেখছেন—

যে বীজ তিনি বহু বছর আগে রোপণ করেছিলেন, সেটি এখন মহীরুহে পরিণত হচ্ছে।

নেতাজির বজ্রকণ্ঠে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মুখরিত।

“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।”

হাজার হাজার ভারতীয় যুবক আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিচ্ছে।

স্বাধীনতার স্বপ্ন আর কেবল স্বপ্ন নয়।

এখন সেটি একটি সশস্ত্র আন্দোলন।

একটি বাস্তব শক্তি।

আর দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখছিলেন রাসবিহারী বসু।

একজন সন্তুষ্ট স্থপতির মতো।

যিনি জানেন—

ভবনের সৌন্দর্যের জন্য মানুষ হয়তো স্থপতির নাম মনে রাখবে না।

কিন্তু ভিত্তি ছাড়া ভবন কখনও দাঁড়ায় না।

১৯৪৫ সাল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের দিকে।

জাপান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

চারদিকে অনিশ্চয়তা।

আর ঠিক সেই সময়েই রাসবিহারী বসুর জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হলো।


১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি।

টোকিও।

সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এই মহান বিপ্লবী।

তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৮ বছর।

তিনি স্বাধীন ভারত দেখতে পারেননি।

তিনি দেখতে পারেননি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের সূর্যোদয়।

তিনি শুনতে পারেননি লালকেল্লার ওপর উড়তে থাকা স্বাধীন ভারতের পতাকার গল্প।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়—

সত্যিই কি তিনি স্বাধীনতা দেখেননি?

হয়তো দেখেছিলেন।

কারণ স্বাধীনতা শুধু একটি তারিখ নয়।

স্বাধীনতা একটি ধারণা।

একটি স্বপ্ন।

একটি বিশ্বাস।

আর সেই বিশ্বাসকে জীবিত রাখার জন্য রাসবিহারী বসু তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।


জাপান সরকার তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

জাপানের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করত।

তিনি শুধু একজন ভারতীয় বিপ্লবী ছিলেন না।

তিনি ভারত ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বের এক জীবন্ত সেতু ছিলেন।

আজও টোকিওর ইতিহাসে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—

ভারতে আমরা অনেকেই তাঁর নাম জানি,

কিন্তু তাঁর অবদান সম্পর্কে খুব কম জানি।

আমরা নেতাজিকে স্মরণ করি।

ভগত সিংকে স্মরণ করি।

খুদিরামকে স্মরণ করি।

এবং অবশ্যই স্মরণ করা উচিত।

কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখা উচিত সেই মানুষটিকেও,

যিনি নেতাজির আগেই বিদেশের মাটিতে স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর স্বপ্ন দেখেছিলেন।

যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চোখে ধুলো দিয়ে বছরের পর বছর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

যিনি নিজের দেশ ছেড়েছেন,

কিন্তু দেশের স্বপ্ন ছাড়েননি।

যিনি নিজের পরিচয় হারিয়েছেন,

কিন্তু জাতির পরিচয় রক্ষার লড়াই চালিয়ে গেছেন।

হয়তো সেই কারণেই রাসবিহারী বসুর জীবন আমাদের একটি অমূল্য শিক্ষা দেয়—

মহান কাজের জন্য সবসময় আলোয় থাকতে হয় না।

সবসময় মঞ্চের কেন্দ্রে থাকতে হয় না।

অনেক সময় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন সেই মানুষরা,

যারা পর্দার আড়ালে থেকে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে দেন।

রাসবিহারী বসু ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা।

তিনি ছিলেন সংগঠক।

তিনি ছিলেন বিপ্লবী।

তিনি ছিলেন সেতুবন্ধন।

আর সর্বোপরি—

তিনি ছিলেন সেই মানুষ,

যিনি ভারতের স্বাধীনতার আগুনকে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

আজকের “বাংলার কিংবদন্তিদের খোঁজে” পর্ব এখানেই শেষ করছি।

পরের পর্বে আমরা ফিরে আসব বাংলার ইতিহাসের আরেক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বের গল্প নিয়ে।

ততদিন মনে রাখবেন—

কিছু মানুষ শুধু ইতিহাসের অংশ নন।

তাঁরাই ইতিহাস তৈরি করেন।

আর রাসবিহারী বসু ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।


বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে with new Legend’s story…