“মাসিমার ঝুলি:স্মার্টফোন হওয়ার স্বপ্ন”
আজ মাসিমা অন্যদিনের মতো নেই। তার চোখে এক গভীর ভাব ,এক গভীর শান্তি। ছোটরা তার চারপাশে গোল করে বসে আছে, প্রত্যেকে অপেক্ষায়, আজ মাসিমার ঝুলিতে কী গল্প লুকিয়ে আছে তা জানার জন্য। মাসিমা ধীরে ধীরে বললেন,
“আজ তোমাদের এমন এক গল্প শোনাব, যা শুনলে হয়তো তোমরা নিজেরাও ভাবতে বসে যাবে। এটা শুধু একটি ছোট্ট ছেলের ইচ্ছার গল্প নয়, বরং আমাদের সবার জীবনের আয়না। শোনো তবে…”
[গল্পের শুরু]
এক মফস্বল গ্রামে একটি ছোট্ট পরিবার—অমিত, তার স্ত্রী রাখী, আর তাদের ছয় বছরের ছেলে রৌণক। মা-বাবা দুজনেই খুব ব্যস্ত। বাইরে থেকে এই পরিবারটিকে দেখে মনে হত সব ঠিকঠাক। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল এমন এক কষ্ট, যা কেউ কখনো বুঝতে পারেনি।
সন্ধ্যায় খাওয়া-দাওয়ার পর, রাখী তার ছাত্রদের খাতা দেখছিলেন। তিনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
অমিত পাশে বসে টিভিতে খবর দেখছিল। চারপাশে এক শান্ত পরিবেশ।
[দৃশ্য ১: টেবিলের দৃশ্য]
হঠাৎ, রাখীর চোখ ভিজে উঠল। সে এক দৃষ্টিতে খাতার দিকে তাকিয়ে রইল।
অমিত টিভি বন্ধ করে রাখীর দিকে তাকাল।
অমিত (উদ্বিগ্নভাবে): “কী হয়েছে, রাখী? তুমি কাঁদছ কেন?”
রাখী মাথা নিচু করে বলল,
“ ছাত্রদের ‘আমার ইচ্ছা’ শিরোনামে রচনা লিখতে বলেছিলাম। সবাই ভালো লিখেছে, কিন্তু একটা রচনা আমাকে থমকে দিয়েছে।”
অমিত কৌতূহলী হয়ে বলল,
“একটা রচনার জন্য কাঁদার কী হলো?”
রাখী তার হাত থেকে একটা পাতলা খাতা তুলে নিলেন। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
রাখী ধীরে ধীরে রচনাটি পড়তে শুরু করল।
“আমার ইচ্ছা স্মার্টফোন হওয়া। আমার বাবা-মা স্মার্টফোনকে খুব ভালোবাসেন।
তারা সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে ডাকলেও কেউ শোনে না।
বাবা ফোনে গেম খেলেন, কিন্তু আমার সাথে খেলেন না।
মা ফোনে কথা বলেন, কিন্তু আমার সাথে কথা বলেন না।
ফোন চার্জ ফুরিয়ে গেলে তারা যত্ন করে চার্জ দেয়।
কিন্তু আমাকে খেতে দেওয়া অনেক সময় ভুলে যান।
তাই আমি স্মার্টফোন হতে চাই। যাতে বাবা-মা আমাকে কাছে রাখেন।”
রচনাটি পড়া শেষ হলে ঘরে গভীর নীরবতা নেমে এল। অমিত স্থবির হয়ে বসে রইল।
অমিত ধীরে বলল,
“এই রচনাটি কার?”
রাখী চোখ মুছে বলল,
“আমাদের ছেলে রৌণক লিখেছে। এটা তার ইচ্ছা।”
অমিত যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার চোখ দিয়ে জল গড়াতে শুরু করল। দুজনেই বুঝতে পারল, তাদের দৈনন্দিন অভ্যাস তাদের সন্তানের কতটা ক্ষতি করছে।
[রাতের গভীর মনের পরিবর্তন]
রাতেই তারা রৌণকের ঘরে গেল। ছোট্ট ছেলেটি গভীর ঘুমে ছিল। তার পাশেই পড়ে ছিল একটা ছেঁড়া রঙিন পেন্সিল। অমিত তার মাথায় হাত রেখে বলল,
“আমাদের ছেলেকে আমরা কতটা অবহেলা করেছি…”
রাখী কেঁদে বলল,
“ও শুধু একটু সময় চেয়েছে। শুধু একটু ভালোবাসা।”
পরের দিন সকালে, রৌণক যখন ঘুম থেকে উঠল, তার মা-বাবা তার সামনে বসে।
অমিত (গভীরভাবে): “রৌণক, আমরা ভুল করেছি। আমরা তোমাকে বুঝতে পারিনি। আজ থেকে তোমার সাথে প্রতিদিন সময় কাটাব। আমাদের ফোন আর তোমার মধ্যে আসতে দেবে না।”
রাখী (গাল টিপে): “তুমি আর কখনো মনে করবে না, আমরা তোমাকে ভালোবাসি না। তুমি আমাদের পৃথিবী।”
রৌণক মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“তাহলে আমি আর স্মার্টফোন হতে চাই না। আমি শুধু চাই, তোমরা আমার পাশে থাকো।”
[মাসিমার শিক্ষা]
গল্প শেষ করে মাসিমা ছোটদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমরা কী বুঝলে? এই ছোট্ট গল্পটি আমাদের শেখায় যে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা কখনোই আমাদের প্রিয়জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। মনে রেখো, যে সময় আমরা দিই না, তা আর কখনো ফেরত আসে না।”
ছোটরা সবাই যেন গল্পের গভীরে ডুবে গিয়েছিল। মাসিমা মুচকি হেসে বললেন,
“তোমরা বড় হলে যেন তোমাদের প্রিয়জনদের সময় দিতে ভুলো না। কারণ ভালোবাসা আর মনোযোগই জীবনের আসল সম্পদ।”
মূল বার্তা:
আমাদের জীবনে প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু তা কখনোই সম্পর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসুন, আমরা আমাদের প্রিয়জনদের সময় দিই, তাদের কথা শুনি, এবং তাদের অনুভব করি।