অমূল্য রত্ন
জীবনে এমন কিছু রাত আসে,
যখন অন্ধকার শুধু আকাশে থাকে না—মনের ভেতরেও নেমে আসে।
ঠিক এমনই এক অন্ধকার রাতে, একজন মানুষ হাঁটছিল।
তার নাম জানা নেই। পরিচয় নেই।
শুধু জানা ছিল—সে খুব ক্লান্ত।
দিনের পর দিন সংগ্রাম, ব্যর্থতা, অপূর্ণ স্বপ্ন আর অপমান—
সব মিলিয়ে তার জীবন যেন এক দীর্ঘ ক্লান্তির গল্প।
সে অনেক লড়েছে, অনেক সহ্য করেছে,
কিন্তু আজ মনে হচ্ছিল—আর না।
সেদিন রাতে, পা দুটো আপনাআপনিই তাকে নদীর ধারে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছিল।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
জলের উপর চাঁদের আলো কাঁপছে।
আর তার মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই ভাবনা—
“সব শেষ করে দিলে হয়তো শান্তি মিলবে।”
ঠিক তখনই, সে অনুভব করল—
তার পায়ের তলায় কিছু একটা শক্ত বস্তু।
নীচে তাকিয়ে সে দেখে,
মাটি চাপা পড়া একটি পুরোনো ব্যাগ।
কৌতূহল বা আশার কারণে নয়,
বরং সময় কাটানোর জন্যই সে ব্যাগটি তুলে নেয়।
ব্যাগ খুলে দেখে—
ভেতরে শুধু পাথর।
সাধারণ, নিষ্প্রাণ, ওজন ছাড়া কিছু নয়।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ঠিক যেমন নিঃশ্বাস ফেলে মানুষ,
যখন বুঝে যায়—কিছুই বদলাবে না।
হতাশা আর একাকীত্বের ভার কিছুটা লাঘব করতে,
সে ব্যাগ থেকে একটি পাথর তুলে নদীতে ছুঁড়ে দেয়।
পাথরটি জলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে
একটি ঢেউ ওঠে… আবার মিলিয়ে যায়।
সে আরেকটি পাথর তোলে।
আবার ছুঁড়ে দেয়।
আরেকটি… তারপর আরেকটি।
প্রতিটি পাথরের সঙ্গে সঙ্গে
তার মনের ভার যেন একটু একটু করে হালকা হচ্ছিল।
ব্যথা, ক্ষোভ, রাগ, হার মানার যন্ত্রণা—
সব যেন নদীর জলে মিশে যাচ্ছে।
রাত কেটে যাচ্ছিল।
সে বুঝতেই পারল না কখন ব্যাগ প্রায় খালি হয়ে গেল।
এক সময়, পূর্ব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল।
সূর্যের প্রথম রোদ নদীর জলে পড়তেই
সবকিছু একটু পরিষ্কার দেখা যেতে লাগল।
তার হাতে তখন আর মাত্র একটিই পাথর।
শেষ পাথরটি ছুঁড়ে দেওয়ার আগে,
সে হঠাৎ থেমে গেল।
আলোটা ঠিকভাবে পড়তেই
তার চোখ আটকে গেল ওই পাথরের দিকে।
ওটা… পাথর নয়।
ওটা ঝকঝকে।
স্বচ্ছ।
আলোয় ভাঙছে হাজার রকম রঙ।
সে বুঝে গেল—
এটা এক টুকরো হীরে।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা খালি শব্দ হলো।
সারারাত ধরে সে যে পাথরগুলো নদীতে ছুঁড়ে দিয়েছে—
সেগুলোর মধ্যেও কি এমন হীরে ছিল?
ভাবতেই তার হাত কেঁপে উঠল।
অজান্তেই, না বুঝেই,
সে নিজের অমূল্য সম্পদগুলোকে তুচ্ছ ভেবে
নদীতে ফেলে দিয়েছে।
ঠিক এই জায়গায় এসে গল্পটা থামে না—
এখানেই গল্পটা আমাদের দিকে ফিরে তাকায়।
কারণ আমরা সবাই, কোনো না কোনো সময়,
এই মানুষটির মতো হয়ে যাই।
আমাদের ভেতরেও থাকে অনেক “পাথর”—
স্বপ্ন, প্রতিভা, সম্ভাবনা, বিশ্বাস।
আমরা ভাবি সেগুলো তুচ্ছ।
সাধারণ।
অপ্রয়োজনীয়।
আর সেই ভুল ধারণাতেই
আমরা একে একে
নিজেদের অমূল্য হীরেগুলো ফেলে দিই।
হয়তো আপনি ভাবেন—
“এটা দিয়ে কীই বা হবে?”
“আমার দ্বারা আর কিছু সম্ভব না।”
“আমি তো সাধারণ মানুষ।”
কিন্তু ঠিক সেই “সাধারণ” জিনিসটার ভেতরেই
লুকিয়ে থাকতে পারে
আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন।
জীবন আমাদের অনেক সময় আলো ছাড়াই হাঁটতে বাধ্য করে।
কিন্তু আলো না থাকলেও
হীরে হীরে থেকেই যায়।
প্রশ্ন শুধু একটাই—
আপনি কি থেমে তাকাবেন?
নিজের দিকে তাকান।
নিজের স্বপ্নের দিকে তাকান।
যে জিনিসগুলোকে আপনি অবহেলা করছেন,
সেগুলোকে আরেকবার আলোয় ধরে দেখুন।
কারণ প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই আছে
এক টুকরো হীরে।
সে হীরেটাকে চিনুন।
রক্ষা করুন।
আর এমনভাবে আলোকিত হতে দিন,
যাতে তার আলো শুধু আপনার নয়—
অন্যদের জীবনও আলোকিত করে।
জীবন নিজেই এক অমূল্য উপহার।
আর সেই উপহারের ভেতর লুকিয়ে থাকা হীরেটাকে
খুঁজে পাওয়াই
আসল সাফল্য।