Corporate Daduji

A Corporate Daduji’s Creation

Murshidabad Series– 6

সিরিজ: আমার মুর্শিদাবাদ – 6 পর্ব


🎙️ বন্ধুরা,
📍 আজ আমরা হাঁটতে শুরু করেছি মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের এক গভীর, কষ্টমাখা অধ্যায়ে —
“নবাব আলীবর্দী খাঁর শেষ শাসনকাল ও উত্তরাধিকার সংকট”।

📜 এই গল্পটা শুধু রাজনীতি নয়, সম্পর্কের, দায়িত্বের, এবং ভবিষ্যতের পথ তৈরির সংগ্রামের গল্প।

🕌 নবাব আলীবর্দী খাঁ — শেষ সূর্যাস্ত

নবাব আলীবর্দী খাঁ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক। কিন্তু তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে বয়সের ভার আর নানা দিক থেকে আসা রাজনৈতিক চক্রান্তে তিনি ধীরে ধীরে ক্লান্ত হতে থাকেন।

👴 একদিকে ছিল মারাঠা হানার ভয়, অন্যদিকে ছিল বাংলার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা।

আলীবর্দীর জীবনে ছিল এক অপূর্ণতা…তাঁর ছিল তিন কন্যা,
কিন্তু কোনও পুত্রসন্তান ছিল না।

তিন কন্যাকেই তিনি নিজের বড়ভাই “হাজি আহমদ”-এর তিন পুত্র, নোয়াজিশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সাথে মেজ মেয়ে শাহ বেগম এবং জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমেনা বেগম-এর বিয়ে দেন।
🎭 এমন সময়ে তাঁকে ভাবতে হয়েছিল — “আমার মৃত্যুর পর কে এই বিশাল বাংলার ভার নেবে?”


1. Full name : নবাবজাদী মেহের উন নিসা বেগম

  • নবাব আলীবর্দী খাঁর বড় মেয়ে
  • জনপ্রিয় নাম: ঘসেটি বেগম
  • স্বামী: নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান – ঢাকার নায়েব নাজিম
  • সন্তান: নিজ সন্তান না থাকায় পালকপুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন সিরাজের ভাই একরামউদ্দৌলাকে

2. Full name :নবাবজাদী আমিনা বেগম

  • আলীবর্দী খাঁর কনিষ্ঠ কন্যা
  • জনপ্রিয় নাম: আমিনা বেগম
  • স্বামী: জৈনউদ্দিন আহমদ খাঁ – যিনি ছিলেন পাটনার নওয়াব নাজিম(ডেপুটি গভর্নর)
  • সন্তান:
  • 1)মির্জা মহিউদ্দিন সিরাজ উদ-দৌলা (Elder)
  • 2)মির্জা মেহেদী (একরামউদ্দৌলা)(Younger)

3. Full name :নবাবজাদী মুফাখখাম সুলতান বেগম

  • আলীবর্দী খাঁর মেজ মেয়ে/কন্যা
  • জনপ্রিয় নাম:শাহ বেগম
  • স্বামী: সাইয়েদ আহম্মদ খান সওলত জং
  • পুত্র: শওকত জং/জঙ্গ

ভগ্নি/বোন:

  • বড় বোন: ঘসেটি বেগম
  • ছোট বোন: আমিনা বেগম

🏛️ রাজনৈতিক পটভূমি: মুর্শিদাবাদের অশান্ত উত্তরাধিকার

ইতিহাস শুধু রাজা-নবাবের নাম নয়—
তার পেছনে থাকে সম্পর্কের জট, ব্যক্তিগত দুঃখ, আর একেকটা চরিত্রের গভীর অভিমান!

আজকের এই অংশে আমরা দেখবো কেমন ছিল নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজনীতির চারপাশ —
যেখানে সম্পর্ক আর ষড়যন্ত্র একসঙ্গে হেঁটে চলেছে।



👩‍🍼 আলীবর্দী খাঁর কন্যা আমিনার করুণ পরিণতি

আমিনা ছিলেন নবাব আলীবর্দী খাঁর কনিষ্ঠ কন্যা।
তার স্বামী, জয়নউদ্দিন আহমদ খান, ছিলেন পাটনার নওয়াব নাজিম —
যাকে নিজেই নিযুক্ত করেছিলেন আলীবর্দী।

১৭৩৩ সাল।
মুর্শিদাবাদ রাজপরিবারে জন্ম নিল এক শিশু —
নাম রাখা হলো মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উদ-দৌলা।

📜 এই শিশুর জন্মের ঠিক পরেই —
এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো:
নবাব আলীবর্দী খাঁ বিহারের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হলেন।
এমন এক পদ, যা তাঁর রাজনীতির উত্থানের প্রথম সিঁড়ি হয়ে দাঁড়ায়।

🎙️ আর তাই…
আলীবর্দী খাঁ বিশ্বাস করতেন — এই শিশুটি তাঁর জীবনে সৌভাগ্য বয়ে এনেছে।
তাঁর কাছে সিরাজ ছিলেন শুধু নাতি নন —
“ভাগ্যবান সন্তান”, ভাগ্য ফিরিয়ে আনা এক আশীর্বাদ।

⚔️ কিন্তু একদিন সেই পাটনা আক্রমণ করে আফগান বিদ্রোহীরা।
তারা হত্যা করে জয়নউদ্দিনকে এবং আমিনা সহ দুই পুত্রকে বন্দী করে নিয়ে যায়।
🎭 আলীবর্দীর জীবনের এই অধ্যায় ছিল ভেঙে পড়া এক পিতার আর্তনাদ।

⚔️ তিনি যুদ্ধ করলেন, পরিকল্পনা করলেন, কূটনৈতিক চালে আফগান বিদ্রোহীদের পরাস্ত করলেন।

অবশেষে —
তিনি উদ্ধার করেন তাঁর কন্যা আমিনা এবং নাতিদের।

🏰 তারপর —
তাঁদের সবাইকে নিয়ে এলেন মুর্শিদাবাদে।


⚰️ পিতার মৃত্যু মানে ছিল এক বিশাল শূন্যতা।
কিন্তু সেই শূন্যতার মাঝেই জন্ম নিল এক অনির্বচনীয় সম্পর্ক —
দাদু আর নাতির…
একদিকে প্রবীণ নবাব, অন্যদিকে রক্তমাখা ভবিষ্যতের উত্তরাধিকার।

🏰 নবাব নিজে তুলে নিলেন দায়িত্ব —
দুধের শিশুকে গড়ে তোলার, আগুনের মতো একটি চরিত্রে পরিণত করার।
প্রাসাদের ভেতরেই শুরু হল এক রাজকীয় শিক্ষা —

📚 দিনে দিনে শেখানো হতো —
📖 কোরআনের পাঠ,
⚔️ তরবারির দীক্ষা,
🎓 প্রশাসনের কৌশল,
🧠 আর রাজার মতো বিচারের বোধ।

🌙 রাতে দাদুর কোল —
সেখানে গল্প নয়, থাকত ইতিহাসের পাঠ, যুদ্ধের স্মৃতি,
আর রাজনীতি নামক সেই জটিল খেলাটার গোড়ার পাঠ।

🎙️ বন্ধুরা,
এইখানেই শুরু হয় সিরাজ-উদ-দৌলার যাত্রা


👑 ঘসেটি বেগম ও তার দুঃখের গল্প

ঘসেটি বেগম, নবাব আলীবর্দী খাঁর বড় মেয়ে। তাঁর স্বামী ছিলেন নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান ।নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান, যিনি ঢাকার নায়েবে নাজিম ছিলেন, ১৭৪০ সালে মতিঝিল হ্রদের তীরে ‘সাং-ই-দালান’ নামে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন।

কিন্তু দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন, তাই তাঁরা আদরের ভাইপো মির্জা মেহেদী (একরামউদ্দৌলা) কে (সিরাজউদ্দৌলার কনিষ্ঠ ভাইকে )পালকপুত্র করে নেন।

⚰️ কিন্তু ভাগ্যের নির্মম খেলায় —
এই একরামউদ্দৌলা অল্প বয়সে গুটিবসন্তে মারা যায়।
তারপরেই দুঃখে-যন্ত্রণায় মৃত্যু হয় নওয়াজিশ মুহাম্মদের।

💰 সেই মৃত্যু রেখে গেল ঘসেটি বেগমের হাতে বিশাল ধন-সম্পদ —
কিন্তু সেই সম্পদের সঙ্গে জন্ম নিলো এক অদৃশ্য রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা।


🔥 সিরাজ-উদ-দৌলার তারুণ্য:

🪔 সময় গড়াতে থাকে।
শৈশবের সেই আদরের রাজপুত্র সিরাজ,
ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক তেজস্বী যুবকে।

⚔️ তার চোখে ছিল আগুন,
বুকে ছিল আত্মবিশ্বাস,
আর অন্তরে ছিল এক নবাবি অহংকারের বীজ।

⚔️ দাদু আলীবর্দী খাঁ তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন তরবারি, রাজনীতি আর নেতৃত্বের পাঠ।
কিন্তু…

সঠিক শাসন ও সংযমের অভাবে
🔥 তিনি হয়ে উঠলেন — উগ্র, অধৈর্য, হট টেম্পারড এক যুবক।

🎭 যার রক্তে ছিল রাজপুত্রের অহংকার,

আর মগজে ছিল এক আগুনে বিস্ফোরণ!

📜 একদিকে ছিল দাদুর শাসনহীন ভালোবাসা,
আর অন্যদিকে ছিল এক শূন্যতা —
যেখানে শিখেছিল যুদ্ধ, কিন্তু শেখেনি ধৈর্য।
শিখেছিল শাসন, কিন্তু শেখেনি সহনশীলতা।

অনেকে আমার সঙ্গে এই বিষয়ে একমত নাও হতে পারেন, তাঁদের জন্যই পরবর্তী গল্প।


🎖️ সিরাজ-উদ-দৌলার বিদ্রোহ:

১৭৪৬ সালে আলিবর্দী খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে কিশোর সিরাজ তার সাথী হন।
বয়স কম, কিন্তু সাহসের অভাব নেই এক বিন্দুও।

👑 যুদ্ধশেষে, দাদু আলীবর্দী তাঁকে সম্মান দিয়ে পাটনার শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেন।
কিন্তু তাঁর বয়স অল্প — তাই রাজনীতির ভার দিয়ে দেওয়া হয় একজন অভিজ্ঞ রাজার — জানকীরাম

কিন্তু বিষয়টি সিরাজদ্দৌলাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি



🔥 তাই তিনি একদিন গোপনে কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরকে নিয়ে ভ্রমণের নাম করে নবপরিণীতা স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে সঙ্গে নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে বের হয়ে পড়েন।

🚶‍♂️ কারও অনুমতি নয়,
কোনো ঘোষণা নয়,
একেবারে গোপনে মুর্শিদাবাদ থেকে রওনা হলেন পাটনার পথে

🛡️ সোজা গিয়ে হাজির হলেন পাটনা দুর্গে,
আর সেখানে দাঁড়িয়ে জানকীরামকে “শাসনভার হস্তান্তরের নির্দেশ” দিলেন।

⚠️ কিন্তু জানকীরাম বিনা অনুমতিতে নবাবের দেওয়া দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি দুর্গের দরজা বন্ধ করে দেন,
আর বৃদ্ধ নবাবের কাছে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দূত পাঠান।


💣 অন্যদিকে, সিরাজের ধৈর্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
তিনি মনে করেন —
এটা আমার অপমান।
⚔️ তাই আর দেরি না করে দুর্গ আক্রমণ করেন।
এক কিশোরের আবেগ রূপ নেয় এক ক্ষুব্ধ নবাবের রণহুঙ্কারে।

⚔️ শুরু হয় উভয়পক্ষের সংঘর্ষ।

তীব্র লড়াই শুরু হয়

একটা ধ্বংসাত্মক শব্দ…
🔥💥
প্রকাণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল আকাশ,
এবং…

দুর্গ থেকেও পড়ল গোলা!

সিরাজের প্রিয় বন্ধু মেহেদী নেশা খা, যুদ্ধক্ষেত্রে লুটিয়ে পড়লেন রক্তাক্ত হয়ে।

এক পলক…
মাত্র এক পলকেই সিরাজের সব উত্তেজনা, যুদ্ধের স্বপ্ন, বীরত্বের অহংকার গলে গেল।

হৃদয়টা কেঁপে উঠল—

🎭 তরুণ সিরাজের চোখে প্রথমবার ধরা পড়ল
যুদ্ধ মানেই মৃত্যু.

যুদ্ধ মানেই গৌরব নয়, বেদনার আর্তনাদ।

সিরাজের যুদ্ধের স্বাদ মিটে গেল নিমেষেই।

সিরাজ বাস্তবের মুখোমুখি সম্মুখীন হলেন।
👴 খবর পেয়ে নিজেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান নবাব আলীবর্দী খাঁ এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।


🎙️ তিনি সকলকে নিয়ে বসেন দুর্গের দরবারে
👑 আর সেদিনই —
আলীবর্দী খাঁ সবার সামনে ঘোষণা দেন:

“ আমার পরে সিরাজ-উদ-দৌলাই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করবে। ”
ইতিহাসে এই ঘটনাকে সিরাজ-উদ-দৌলার যৌবরাজ্যাভিষেক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই সময়ে সিরাজ-উদ-দৌলার বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর।


তবে তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তার আত্মীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। অনেকেই তার বিরোধিতা শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলিবর্দি খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম।


📌 বন্ধুরা,
আজকের পর্ব এখানেই শেষ…
গল্প তো সবে শুরু…

🕯️ সামনে অপেক্ষা করছে আরও গভীর ষড়যন্ত্র, আরও শ্বাসরুদ্ধকর মোড়,
আর ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর সত্য —
ঘরের মধ্যেই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু।

📖 আসছে পর্বে আমরা জানবো —
👉 কীভাবে সিরাজ-উদ-দৌলার চারপাশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো বিশ্বাসঘাতকদের অদৃশ্য জাল,
👉 আর সেই জালের মাঝেই জন্ম নিল এক নাম —
মীর জাফর!
এক সেনাপতি…
এক আত্মীয়…
আর এক ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতক,
যার ছুরির ক্ষত এখনও বাংলার বুকে বয়ে যায়।

🎬“মুর্শিদাবাদ: ইতিহাসের গন্ধমাখা পথ – পর্ব ” খুব শীঘ্রই আসছে!


বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…