ইতিহাসের অন্দরমহল থেকে মুর্শিদাবাদ ফিরে দেখা
Title:“আলীবর্দী খাঁর ভয়ঙ্কর লড়াই – মারাঠা হানার বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধ”
বন্ধুরা…
আজ আমরা ঢুকে পড়ছি মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে—
যেখানে বাংলার মাটি বারবার কেঁপে উঠেছিল
ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দে,
লোহার তরবারির ঝংকারে,
আর ধ্বংসের আতঙ্কে।
এই অধ্যায়ে আমরা দেখবো —
✅ মারাঠা আক্রমণের ভয়াবহতা
✅ “ভুরভুরিয়া” ডাকের মানে কী ছিল?
✅ কেন বাংলার সাধারণ মানুষ বিভীষিকায় কেঁপে উঠত?
✅ আর কেমন ছিলেন সেই সময়ের বীর নবাব — আলীবর্দী খাঁ!
🕰️ সময়: ১৭৪২ সাল।
নবাব আলীবর্দী খাঁ সদ্য সিংহাসনে বসেছেন।
রাজ্যের অভ্যন্তরে তখনও ষড়যন্ত্রের সুর বেজে চলেছে,
আর ঠিক তখনই…
⚔️ শুরু হল এক নতুন সর্বনাশের ঝড় — মারাঠা হানা।
🚨 কিন্তু কারা ছিল এই মারাঠারা?
আলীবর্দী খাঁর শাসনামলে বাংলায় মারাঠা আক্রমণ ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত মারাঠা নেতা রঘুজি ভোঁসলে বারবার বাংলায় আক্রমণ চালান।
😱 “ভুরভুরিয়া এল!” — এই ডাক মানেই ছিল মৃত্যু, লুটপাট, ধর্ষণ!
গ্রামে-গঞ্জে আতঙ্কের ছায়া…
লোকজন ভয়ে ঘর ছেড়ে পালায়,
মায়েরা সন্তানকে কোলে নিয়ে লুকিয়ে পড়ে ধানের গোলায়।
🔥 একবার নয়… বারো বার
— হ্যাঁ, ঠিক শুনছেন, ১২ বার বাংলায় হানা দেয় মারাঠারা
আনুমানিক ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত।
প্রতি বার হানার পর বাংলার জনজীবন আরও ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত।
খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?
🎙️ এই ছড়া ছিল না শুধু শিশুদের ঘুম পাড়ানোর গান —
এটা ছিল সেই ভয়, শঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা আর অসহায়তার প্রতিচ্ছবি
যা বাংলার মানুষ প্রতিদিন টের পাচ্ছিল।
মারাঠাদের এই ডাকাতি-ধরনের অভিযানকে বলে “চৌথ আদায়”,
যেখানে তারা রাজ্য দখল করত না,
কিন্তু আগুন লাগিয়ে, মানুষ মেরে, ধন লুটে নিয়ে চৌথ বা জোরপূর্বক কর আদায় করত।
🛡️ আর এই সময়…
একজন নবাব একা হাতে সামলাচ্ছিলেন এই তাণ্ডব —
আলীবর্দী খাঁ।
তিনি জানতেন, এটা শুধু যুদ্ধ নয় —
এটা ছিল বাংলা সভ্যতা, সংস্কৃতি আর অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
🎯 তিনি নিজে সেনা নেতৃত্ব দেন।
প্রাচীন, দুর্বল মুঘল বাহিনী নয়,
নিজের হাতে গড়ে তোলেন নতুন সৈন্যদল।
তাঁর যোদ্ধারা ছিল সাহসী, কিন্তু সংখ্যা কম, অস্ত্র অপ্রতুল।
🎖️ কিন্তু প্রশ্ন ছিল —
এই অসম যুদ্ধে কতদূর এগোতে পারলেন আলীবর্দী?
আলীবর্দী খাঁ বিভিন্ন যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজিত করলেও, ১৭৫১ সালে চুক্তির মাধ্যমে ওড়িশা মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং বার্ষিক ১২ লাখ টাকা চৌথ কর দিতে সম্মত হন।
💰 বাংলার কোষাগার ফাঁকা হয়ে গেল ।
🏚️ কৃষি, বাণিজ্য সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ল।
👥 লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেন।
আর এই আতঙ্কের ভিতরেই জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন নাম—
সিরাজ-উদ-দৌলা।
এক দাদুর কোলে মানুষ হওয়া রাজপুত্র,
যিনি সামনে বাংলার পরবর্তী ইতিহাসে হবেন মুখ্য চরিত্র।
📜 ইতিহাস বলবে—
আলীবর্দী হারেননি।
তবে এই যুদ্ধ, এই বারো বার মারাঠা হানা,
তাঁকে শারীরিকভাবে ভেঙে দেয়।
কিন্তু বাংলা আজও তাঁকে মনে রাখে —
একজন যোদ্ধা নবাব হিসেবে,
যিনি শেষদিন পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন বাংলার জনতার জন্য।
📢 বন্ধুরা, পরের পর্বে আমরা জানবো—
➡️ সিরাজের শৈশব,
➡️ দাদু আলীবর্দীর আদরে বেড়ে ওঠা,
➡️ আর কীভাবে তৈরি হচ্ছিল সেই ট্র্যাজিক চরিত্র,
যার ভাগ্যে লেখা ছিল পলাশীর যুদ্ধ আর বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস।
🔔 শেষের কথা:
“এক দাদু লড়লেন শেষদিন পর্যন্ত…
আর এক নাতি সামনে এগিয়ে আসছে এক রক্তাক্ত মঞ্চে—
যেখানে ইতিহাস শুধু লেখা হবে না…
তারপর থেকে কাঁদবে গোটা বাংলা।”
▶️ [পরবর্তী পর্বে…]
“আমার মুর্শিদাবাদ – পর্ব ৬: দাদুর কোলে বড় হওয়া সিরাজ – এক ট্র্যাজিক নায়কের জন্ম”