ইতিহাসের অন্দরমহল থেকে মুর্শিদাবাদ ফিরে দেখা
২০০১ সাল।
বাড়ি ছেড়েছিলাম।
পড়াশোনা, চাকরি – জীবনের পেছনে ছুটতে ছুটতে
দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছি, কাজ করেছি, শিখেছি,
নানান রকম মানুষের সংস্পর্শে এসেছি।
আর এই ব্যস্ততার মধ্যেই
একটা নাম… একটা গন্ধ… একটা শিকড়
প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
👉 মুর্শিদাবাদ – আমার জন্মস্থান, আমার নিজের জেলা,
আমার শিকড়… আমার আত্মপরিচয়।

বছরে মাত্র একবার যাওয়া হয় –
মা-বাবার সাথে একটু দেখা, পুরনো গলিতে একটু হাঁটা,
নদীর ধারে কিছুক্ষণ বসা…
তারপর আবার ফিরে আসা এই চার দেওয়ালের কংক্রিট দুনিয়ায়।
❝ আমি হয়তো মুর্শিদাবাদকে ভুলে গেছিলাম,
কিন্তু মুর্শিদাবাদ তো আমাকে কোনোদিন ভুলেনি। ❞
এই ২৫ বছরে জীবন অনেক কিছু দিয়েছে,
কিন্তু মুর্শিদাবাদ দিয়েছে শিকড়।
সেই প্রথম স্কুল, প্রথম পুজো, প্রথম ভালোবাসা –
সব তো এখানেই শুরু।
রঘুনাথগঞ্জের গলি, হাজারদুয়ারীর ছায়া, ইমামবাড়ার সেই মাঠ, গঙ্গার ধারের চায়ের দোকান সন্ধ্যার আড্ডা,নাচমহল, দক্ষিণ দরজা, কাশিমবাজারের সরু অলিগলি, বহরমপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম… আর পলাশীর প্রান্তর —
আজও যেন সেই ছোট্ট ছেলেটার জন্য অপেক্ষায় আছে…
যে ছেলেটা স্কুলব্যাগ পিঠে নিয়ে ছুটত,
সন্ধ্যে হলে নদীর পাড়ে বসে থাকত,
আর চায়ের দোকানে বসে শুনত বড়দের গল্প…
আর প্রতিদিন সন্ধ্যের পর — মায়ের খোলা রাখা সেই পুরোনো কাঠের দরজা —
যেটা আজও আমার জন্য অপেক্ষায় আছে…
বাড়ির সেই দরজা,
যেটা হয়তো অনেক দিন খোলা হয়নি,
কিন্তু মন জানে —
সে আজও বন্ধ হয়নি আমার জন্য।
এই মুর্শিদাবাদ, এই প্রতিটি গলি, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি দরজা —
আমার শিকড়, আমার ঘর, আমার ফেরা।
আমার মতো লক্ষ মানুষের মনে
‘মুর্শিদাবাদ’ মানে – এক টুকরো বাড়ি।
একটা গন্ধ, একটা গান, একটা শিকড়।
তাই আজ ভাবলাম,
মুর্শিদাবাদ নামটিকে কেন্দ্র করে সেই সমস্ত জায়গাগুলোর কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরি –
যার সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, নস্টালজিয়া, আর চোখে জল আনা স্মৃতি।
কারণ এই জায়গাগুলো আজ আধুনিকতার ধাক্কায়,
নিরবেই হারিয়ে যাচ্ছে… ধীরে ধীরে…
📜 মুর্শিদাবাদ – এক নবাবি শহরের নামের পেছনের গল্প 📜
তখনকার অনেক শহরের নামকরণ হত প্রতিষ্ঠাতা বা শাসকের নামে।
মুর্শিদাবাদ শহরের নামকরণ মুর্শিদ কুলি খাঁর নামে।

মুর্শিদাবাদ নামটি ১৭০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন বাংলার দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের অনুমতি নিয়ে মাকসুদাবাদ শহরের নাম পরিবর্তন করে নিজের নামানুসারে “মুর্শিদাবাদ” রাখেন।
🕰️ নাম পরিবর্তনের পটভূমি:
- ১৭০১ সালে, মুর্শিদ কুলি খাঁন বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন এবং রাজস্ব প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
- ১৭০২ সালের ২৩ ডিসেম্বর, আওরঙ্গজেব তাকে “মুর্শিদ কুলি খাঁন” উপাধিতে ভূষিত করেন ।”মুর্শিদ” শব্দটি আরবি, যার অর্থ “পথপ্রদর্শক” বা “গুরু”/Pioneer
- ১৭০৪ সালে, তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে মাকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন এবং শহরের নাম পরিবর্তন করে “মুর্শিদাবাদ” রাখেন ।
📜মুর্শিদাবাদ” নামকরণের তাৎপর্য:
- মুর্শিদ=পথপ্রদর্শক” বা “গুরু”Pioneer।
- “আবাদ” ফারসি শব্দ, যার অর্থ “বাসযোগ্য স্থান” বা “নগর”।
- ফলে, “মুর্শিদাবাদ” অর্থ দাঁড়ায় “মুর্শিদের নগর”।পথপ্রদর্শকদের নগর -এক আলোকিত পথপ্রদর্শকের স্বপ্নের শহর।
এই নামকরণ মুর্শিদ কুলি খাঁনের প্রশাসনিক দক্ষতা ও মুঘল সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের প্রতিফলন।
আপনি যদি মুর্শিদাবাদের ইতিহাস নিয়ে আরও জানতে চান, তাহলে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন:
🏛️ আজিমগঞ্জ নামের উৎপত্তি
আজিমগঞ্জ নামটি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি এবং বাংলার সুবাহদার আজিম-উস-সান-এর (আজিমুশান-এর) নামানুসারে রাখা হয়।
📌 পরিচয়:
- পুরো নাম: আজিম-উস-সান মির্জা মুহাম্মদ আজিম-উস-সান বাহাদুর ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৌত্র (নাতি)
- পিতাঃ বাহাদুর শাহ I (শাহ আলম) – Son of আওরঙ্গজেব
- জন্ম: ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দ
- মৃত্যু: ১৭১২ খ্রিষ্টাব্দ
- আজিম-উস-সান ১৬৯৭ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা—এই তিন প্রদেশের সুবেদার (গভর্নর) হিসেবে নিয়োজিত হন।
১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে এই শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আজিমগঞ্জ শহরটি তার সমৃদ্ধ জৈন মন্দির, রাজবাড়ি এবং বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত।
আজকের দিনে ‘গঞ্জ’ শব্দটি শুনলে বোঝা যায়, এটি পুরোনো বাণিজ্য শহর বা বাজার অঞ্চল।“গঞ্জ” মানে কেবল বাজার নয় — এটা বাংলার ইতিহাসে এক একটি বাণিজ্যগাঁথা।
যেখানে পণ্য চলেছে, লোক সমাগম ঘটেছে, সভ্যতা বেড়েছে।
🏛️জিয়াগঞ্জ নামের উৎপত্তি
🔍 জিয়াগঞ্জ নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসে রয়েছে একাধিক কাহিনি ও মতবাদ।
“জিয়াগঞ্জ” নামটি এসেছে ‘জিয়া খাঁ’ বা ‘জিয়াউদ্দিন’ নামে এক প্রভাবশালী জমিদার বা নবাবি আমলার নাম থেকে, যিনি এই অঞ্চলে হাটবাজার গড়ে তুলেছিলেন।
- তিনি ছিলেন নবাবদের আমলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, এবং তাঁর নামেই শহরের নামকরণ করা হয়েছিল।
আরও একটি জনপ্রিয় মত হল “জিয়া” শব্দের অর্থ আরবি ভাষায় হয় “উজ্জ্বলতা”, “আলো”।
কেউ কেউ বলেন, এই শহর ছিল শিক্ষার, সংস্কৃতির ও বাণিজ্যের কেন্দ্র — তাই হয়তো কাব্যিকভাবে নাম হয় “আলোর শহর”=জিয়াগঞ্জ।
তবে প্রথম ব্যাখ্যাটি — অর্থাৎ জিয়া খাঁনের নামে গঞ্জ প্রতিষ্ঠা, বেশি গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে।
🏛️জঙ্গীপুর নামের উৎপত্তি
🔍জঙ্গীপুর নামের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই শহরটি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে “জাহাঙ্গীরপুর” নামে পরিচিত ছিল।
সময়ের সাথে সাথে এই নাম পরিবর্তিত হয়ে “জঙ্গীপুর” রূপে পরিচিতি লাভ করে।
জঙ্গীপুর শহরটি ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত এবং মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা এলাকা। এই শহরটি ঐতিহাসিকভাবে রেশম বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রও এখানে স্থাপিত হয়েছিল। এখানকার জঙ্গীপুর ছিল রেশম শিল্পের এক অন্যতম কেন্দ্র।এমনকি মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের দরবারে আগত ইংরেজ দূত স্যার টমাস রো-ও মুর্শিদাবাদের রেশমশিল্পের প্রশংসা করে গেছেন।
📍 এই জেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বহু নাম —
কাশিমবাজার, রঘুনাথগঞ্জ, লালবাগ, ভগবানগোলা, রসুলপুর, নাচমহল, ফারাজিপাড়া…
আর প্রতিটি নামের সাথেই জড়িয়ে আছে একটা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস,
একটা পুরোনো গলি,
একটা অজানা মুখ,
আর একটা নস্টালজিক অনুভব।
🕰️ এই ধারাবাহিক সিরিজে,
আমি খুঁজে আনবো সেইসব হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস,
বিস্মৃত মানুষজন,
আর সেই শতাব্দী প্রাচীন আত্মার ছাপ —
যা আজও মুর্শিদাবাদের মাটি, বাতাস, গন্ধে ছড়িয়ে আছে।
এটা শুধু ইতিহাস বলার জন্য নয় —
এটা ফিরে দেখা…
একটা মাটি-ছোঁয়া ভালোবাসা…
আর আগামী প্রজন্মকে শিকড় চিনিয়ে দেওয়ার প্রয়াস।
📜 তাই এই সিরিজে থাকুন আমার সাথে…
ঘুরে আসুন মুর্শিদাবাদের সেই অলিগলি,
যেখানে প্রতিটি দেয়ালে লেখা আছে —
একটা হারিয়ে যাওয়া সময়ের কাব্য।
বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…
সেইখানে,
যেখান থেকে স্মৃতির ঢেউ ভেসে আসে,
যেখানে গন্ধে, শব্দে, আর অনুভবে মিশে থাকে শিকড়ের টান —
সেই মুর্শিদাবাদকে ঘিরে আমাদের এই যাত্রা এখানেই শেষ নয়।
আরও অনেক গল্প এখনো বলা বাকি…
আরও অনেক মুখ, মোড়, আর গলি আজও অপেক্ষায় —
“ফিরে আয়… আমি তোকে এখনো ভুলিনি।”
তাই আবার ফিরে আসব পরবর্তী অধ্যায়ে…
পথচলা চলবে,
স্মৃতি নিজেই লিখে যাবে তার পরবর্তী অধ্যায়।