ভাবুন তো—
পৃথিবীর যেকোনো দেশে আপনি থাকুন না কেন,
যদি আপনার পরিচয় হয় ইহুদি,
তাহলে পৃথিবীর একটি দেশ আপনাকে বলবে—
“এই দেশ তোমারও।”
সেই দেশটির নাম ইসরায়েল।

এই সম্পর্কটা শুধু রাজনীতি বা নাগরিকত্বের নয়।
এটা ইতিহাসের, বিশ্বাসের, এবং হাজার বছরের এক জাতিগত বন্ধনের গল্প।
হাজার বছরের বিচ্ছিন্নতা
প্রায় দুই হাজার বছর আগে
রোমান সাম্রাজ্যের আক্রমণের পর
ইহুদিরা তাদের প্রাচীন মাতৃভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা দেশে।

ইউরোপ, রাশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা—
সব জায়গায় তারা বসবাস শুরু করে।
কিন্তু একটি বিষয় তারা কখনও ভুলে যায়নি—
তাদের মূল দেশ ছিল ইসরায়েল।Origin was from Israel.
১৯৪৮ – ইতিহাসের মোড় ঘোরানো বছর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর, বিশেষ করে হলোকাস্টে লক্ষ লক্ষ ইহুদি হিটলার ও তার নাৎসি বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পরে, বিশ্বজুড়ে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে ওঠে—
ইহুদিদের কি নিজেদের একটি দেশ থাকা উচিত নয়?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি জনগোষ্ঠী বারবার নির্যাতন, বৈষম্য ও নির্বাসনের শিকার হয়েছে। হলোকাস্ট সেই যন্ত্রণার চরম পরিণতি।

তাই যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক মহলে সহানুভূতি ও সমর্থনের এক নতুন ঢেউ তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে—ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে দুটি ভাগে ভাগ করা হবে: একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং একটি আরব রাষ্ট্র।

এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবং অবশেষে ১৯৪৮ সালে জন্ম নেয় ইসরায়েল রাষ্ট্র।
এবং ঘোষণা করা হয়—
এটি হবে বিশ্বের সব ইহুদির জাতীয় ঘর।
Law of Return – এক অসাধারণ আইন
ইসরায়েলের সবচেয়ে বিশেষ আইনের নাম হলো
“Law of Return”।
এই আইনের মূল কথা খুব সহজ।

যদি আপনি একজন ইহুদি হন,
তাহলে পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে
আপনি ইসরায়েলে এসে স্থায়ীভাবে থাকতে পারেন।
শুধু তাই নয়—
আপনি খুব সহজেই ইসরায়েলের নাগরিকত্ব পেতে পারেন।
এমনকি
আপনার সন্তান এবং নাতি-নাতনিরাও এই অধিকার পায়।
অর্থাৎ—
ইসরায়েলের দরজা
পৃথিবীর সব ইহুদির জন্য সবসময় খোলা।
ইসরায়েলি পাসপোর্ট
যখন কোনো ইহুদি ইসরায়েলে এসে নাগরিকত্ব নেন,
তখন তিনি পান ইসরায়েলি পাসপোর্ট।
এই পাসপোর্টের মাধ্যমে তিনি—
- ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারেন
- কাজ করতে পারেন
- ভোট দিতে পারেন
- এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতে পারেন
অর্থাৎ, তিনি শুধু একজন অভিবাসী নন—
তিনি হয়ে ওঠেন নিজের দেশের নাগরিক।
কেন এই ব্যবস্থা এত বিশেষ?
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য
বছরের পর বছর বসবাস করতে হয়,
অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়।
কিন্তু ইসরায়েলে—
আপনার পরিচয় যদি ইহুদি হয়,
তাহলেই সেই দেশের সাথে আপনার এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্বীকৃত।
এই কারণেই বলা হয়—
ইসরায়েল শুধু একটি দেশ নয়।
এটি পৃথিবীর সব ইহুদির জাতীয় ঘর।
বাস্তবতার আরেক দিক
Law of Return-এর গুরুত্ব সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারেন
সেই সব মানুষ,
যারা নিজেদের দেশে থেকেও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন কাটান।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—
বাংলাদেশের অনেক হিন্দু বাঙালি,যারা প্রায়ই ভয় নিয়ে বসবাস করেন।
যে কোনো সময় তাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,
কখনো সামাজিক বা রাজনৈতিক চাপ—
এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনের অংশ হয়ে থাকে।
তখন একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—
যদি কোনো দিন তাদের দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে হয়,
তাহলে তারা কোথায় যাবে?
Law of Return এর গভীরতা গুরুত্ব তারাই সত্যিকারের অনুভব করতে পারেন।
১৯৯০ – আরেকটি বড় মোড়
এরপর ১৯৯০ সালে আসে আরেকটি বড় ঐতিহাসিক মোড়।
সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) ভেঙে পড়ে।
সেই সময় প্রায় ১০ লক্ষ ইহুদি (১ মিলিয়ন)
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইসরায়েলে এসে বসবাস শুরু করেন।
কিন্তু এরা শুধু সাধারণ মানুষ ছিলেন না।
তাদের মধ্যে ছিলেন—
- বিজ্ঞানী
- ইঞ্জিনিয়ার
- গণিতবিদ
- ডাক্তার
ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই
ইসরায়েলের জনসংখ্যা প্রায় ২০% বেড়ে যায়।
আর এর সাথে সাথে
ইসরায়েল হঠাৎ করেই পেয়ে যায়
পৃথিবীর অন্যতম শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মশক্তি।

কিন্তু তখনও একটি বড় সমস্যা ছিল
যদিও দক্ষ মানুষের অভাব ছিল না,
তবুও একটি বড় সমস্যা রয়ে গিয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইসরায়েলে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছিলেন।
অর্থাৎ—
মেধা ছিল,
আইডিয়া ছিল,
কিন্তু পুঁজি ছিল না।
তখন ইসরায়েল সরকার খেলল এক “মাস্টারস্ট্রোক”
এই সমস্যার সমাধান করতে
ইসরায়েল সরকার একটি অসাধারণ পরিকল্পনা চালু করল।
এর নাম ছিল—
“Yozma Fund”।
১৯৯৩ সালে
ইসরায়েল সরকার একটি Government Venture Capital Fund চালু করে।
এর নিয়ম ছিল খুবই সহজ কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত।
যদি কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী
কোনো ইসরায়েলি স্টার্টআপে ৬০% বিনিয়োগ করেন,
তাহলে বাকি ৪০% বিনিয়োগ করবে সরকার।
কিন্তু সবচেয়ে চতুর শর্তটি ছিল এখানে।
যদি স্টার্টআপ ব্যর্থ হয় —
তাহলে লোকসান ভাগ হবে দুই পক্ষের।
কিন্তু যদি স্টার্টআপ সফল হয়—
তাহলে ৫ বছর পরে
বিনিয়োগকারী চাইলে
সরকারের ৪০% শেয়ার মূল দামে কিনে নিতে পারবে।
অর্থাৎ—
ঝুঁকি সরকারের।
লাভ বিনিয়োগকারীর।
ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য
এই পরিকল্পনা ঘোষণার পর
আমেরিকা, ইউরোপ এবং জাপানের
অনেক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারী ইসরায়েলে বিনিয়োগ শুরু করেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই—
১৬০টিরও বেশি স্টার্টআপ
এই ফান্ড থেকে বিনিয়োগ পায়।
আর এই স্টার্টআপগুলোর অনেকই পরে
বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়।
আরেকটি বড় সমস্যার সমাধান
এই পুরো উদ্যোগের মাধ্যমে ইসরায়েল সরকার আরেকটি বড় সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর যে উচ্চশিক্ষিত মানুষের ঢল ইসরায়েলে এসেছিল, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—
কাজ কোথায়?
এদের অনেকেই ছিলেন
বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, গণিতবিদ, গবেষক।
কিন্তু যদি তাদের মেধা ব্যবহার করার মতো সুযোগ না তৈরি হতো,
তাহলে এই বিশাল মানবসম্পদ অচিরেই বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারত।
ঠিক সেখানেই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম হয়ে উঠল সমাধান।
নতুন নতুন প্রযুক্তি কোম্পানি তৈরি হতে শুরু করল।
গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে
হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলো।
অর্থাৎ—
একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ এলো,
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত মানুষের জন্য তৈরি হলো অসংখ্য কাজের সুযোগ।
ফলে ইসরায়েল শুধু অর্থনৈতিকভাবেই শক্তিশালী হলো না,
তারা তৈরি করল এক উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি।
এবং এই যাত্রা এখনো চলছে
আজ ইসরায়েল পৃথিবীর অন্যতম বড় টেকনোলজি ও ইনোভেশন হাব।
সাইবার সিকিউরিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স,
এগ্রি-টেক, ডিফেন্স টেকনোলজি, মেডিক্যাল ইনোভেশন—
প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইসরায়েল আজ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
এই পুরো গল্পটা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
একটি ছোট দেশ,
সীমিত সম্পদ,
চারপাশে নিরাপত্তা সংকট থাকা সত্ত্বেও—
যদি মানুষের মেধাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়,
তাহলে একটি জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই বদলে দিতে পারে।
আর সেই কারণেই—
ইসরায়েলের এই যাত্রা আজও চলছে।
Corporate Daaduji signing off…
আবার দেখা হবে পরের পর্বে,
আরও কিছু শক্তিশালী বাস্তব গল্প নিয়ে।