গভীর সুখের অনুসন্ধান-মাসিমার ঝুলি:
“তুই সুখী হতে চাস?”
সন্ধ্যার আড্ডায় মাসিমার এই প্রশ্ন শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল।
আমরা চোখের দিকে তাকালাম।
মাসিমা একটু হাসলেন, তারপর বললেন—
“এমন একটাও মানুষ নেই, যে বলে আমি সুখ চাই না।
কিন্তু বল তো, সুখ আসলে কী?
কেউ কি জানে?”
আমরা অনেক উত্তর দিলাম। কেউ বলল, “টাকা।”
কেউ বলল, “পরিবার।”
আবার কেউ বলল, “স্বপ্ন পূরণ।”
মাসিমা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—
“এসব তো ঠিক। কিন্তু এগুলো কি সত্যিই সুখ এনে দেয়?
চল, একসঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।”
সুখের ফর্মুলা: H = p + E + M
মাসিমা শুরু করলেন,
“একজন বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী, মার্টিন সেলিগম্যান, সুখের একটি সহজ এবং গভীর সংজ্ঞা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, সুখ = প্লেজার + এনগেজমেন্ট + মিনিং।
মানে,
H = p + E + M
১. প্লেজার (P – আনন্দ)
প্লেজার মানে হলো প্রতিদিনের ছোট ছোট আনন্দ।
একটা চকলেট খাওয়া, একটা সুন্দর গান শোনা, বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো।
এসব আনন্দ অবশ্যই সুখ দেয়।
কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী নয়।
চকলেট ফুরিয়ে গেলে, গানের শেষ নোট বাজলে, সেই আনন্দও মিলিয়ে যায়।
২. এনগেজমেন্ট (E – সম্পৃক্ততা)
এরপর আসে সম্পৃক্ততা।
কোনো কাজ, কোনো পেশা, এমনকি শখ—যা তোমার মন পুরোপুরি দিয়ে করো।
একজন ক্রিকেটার যখন তার খেলার জন্য নিজেকে নিংড়ে দেয়,
একজন শিল্পী যখন তার শিল্পে মগ্ন থাকে,
তখন সে গভীর এক আনন্দ খুঁজে পায়।
এটা সুখের আরেক ধাপ।
৩. মিনিং (M – জীবনের অর্থ)
তবে, জীবনের সত্যিকারের সুখ আসে যখন তুমি জীবনের গভীর অর্থ খুঁজে পাও।
শুধু আনন্দ বা কাজই নয়,
তুমি যখন অন্যের জন্য কিছু করো,
যখন তুমি বুঝতে পারো যে তোমার জীবনের বড় কোনো উদ্দেশ্য আছে,
তখনই সত্যিকারের সুখের জন্ম হয়।
মহাত্মা গান্ধী বা ভগিনী নিবেদিতা—তারা শুধু নিজেদের জন্য বাঁচেননি।
তারা জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন এবং সেই অর্থই তাদের সুখী করেছিল।
ভারতীয় দর্শন: কাম, অর্থ, ধর্ম এবং মোক্ষ
মাসিমা একটু থামলেন। তারপর বললেন,
“জানিস তো, এই ফর্মুলাটা আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রেও আছে।
বেদে একে বলা হয়েছে পুরুষার্থ।
পুরুষার্থের চারটি স্তম্ভ:
১. কাম (আনন্দ): ছোট ছোট ইচ্ছা পূরণ। জীবন উপভোগ করা।
২. অর্থ (সম্পৃক্ততা): জীবনের জন্য সম্পদ, কাজ, এবং দায়িত্ব পালন।
৩. ধর্ম (অর্থ): জীবনের গভীর উদ্দেশ্য, ন্যায় আর সত্যের পথ।
৪. মোক্ষ (মুক্তি): স্থায়ী সুখের জন্য মুক্তির পথ।
স্থায়ী সুখ: মোক্ষের গভীরতা
মাসিমা বললেন,
“জানিস তো, কাম, অর্থ আর ধর্ম—এসব সুখ দেয় ঠিকই।
কিন্তু এই সুখ ক্ষণস্থায়ী।
চকলেটের মতো, বা একটি সুন্দর দিনের মতো, একসময় শেষ হয়ে যায়।
তাই, যদি চিরস্থায়ী সুখ চাইতে হয়,
তাহলে যেতে হবে মোক্ষের পথে।
মোক্ষ মানে হলো মুক্তি।
মুক্তি মানে, নিজেকে চেনা।
“আমি কে?”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া।
যখন তুমি নিজেকে চেনো,
তখন তুমি বুঝতে পারো,
তোমার সুখ কোনো বাইরের জিনিসে নেই।
সুখ তোমার নিজের ভেতরেই আছে।”
গভীর চিন্তা: সুখের মায়া আর সত্য
মাসিমা বললেন,
“তুই যখন বাইরের জিনিস দিয়ে সুখ খুঁজিস, তখন সেটা মায়া।
মায়া কখনো স্থায়ী হয় না।
তুই যখন নিজের ভেতরে সুখ খুঁজে পাবি,
তখন সেটা সত্য।
সেই সুখকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।”
তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আজ থেকে প্রতিদিন একটু সময় নে নিজেকে চেনার জন্য।
তোর ইচ্ছা পূরণ কর, কাজ কর, জীবনের অর্থ খুঁজ।
কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা,
তুই কে, তা জানার চেষ্টা কর।
কারণ স্থায়ী সুখের পথ সেখানে।”
শেষ কথা: সুখের আসল খোঁজ
বন্ধুরা, আমরা সবাই সুখী হতে চাই।
কিন্তু সুখ মানে শুধু ধনসম্পদ, নাম, বা কাজ নয়।
সুখ মানে নিজের ভেতরের আনন্দ খুঁজে পাওয়া।
সুখ মানে নিজেকে চেনা।
আজ থেকে সুখের এই পথ শুরু হোক।
H = p + E + M + M
শেষের M মানে মোক্ষ।
তুমি কি প্রস্তুত চিরস্থায়ী সুখ খুঁজে পেতে?
আজ থেকেই শুরু করো। কারণ সুখ তো তোমার ভেতরেই।** 🌟