Corporate Daduji

A Corporate Daduji’s Creation

From Sorrow to Strength

How Two Fathers Faced Their Deepest Pain: Lessons from Arjuna & Jagjit Singh


মাসিমার ঝুলির গল্প: শোকের ভার, প্রতিস্পন্দনের আলো


আজকের দিনটা অন্যসব দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
আজকের পরিবেশ রুক্ষ, বেদনাময়। একটা ছোট্ট ঘরে, মাসিমার কাছে জড়ো হয়েছেন কয়েকজন মানুষ—তাদের চোখে অশ্রু, হৃদয়ে শূন্যতা। এরা সেই মানুষ, যারা সদ্য তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন।


তাদের মন ভেঙে চুরমার।
কেউ হারিয়েছে মাকে, যিনি জীবনের প্রতিটি পথে হাত ধরে চলতে শিখিয়েছিলেন। কেউ হারিয়েছে ভাইকে, যার সঙ্গে ছিল হাসি-খুনসুটির দিনগুলো। আর কেউ হারিয়েছে তাদের একমাত্র সন্তানকে—যে ছিল তাদের স্বপ্ন, তাদের ভবিষ্যৎ। সেই শোকের ভার যেন হৃদয়ের প্রতিটি কোণে ব্যথার সুর বাজিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই তারা শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না।

তারা শুনেছে, “মাসিমার ঝুলিতে” এমন কিছু গল্প আছে, যা শোকের গভীর অন্ধকার থেকে মুক্তির আলো দেখাতে পারে। তাই বুকভরা আশা নিয়ে তারা এসেছে মাসিমার কাছে।


আজ মাসিমা শান্ত, ধীরস্থির। তার চোখে একটা গভীরতা, মুখে একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য। তিনি ধীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা বলতে পারো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস কী?”

ঘরের মধ্যে একটা ক্ষণিকের হট্টগোল। সবাই নিজের মতো উত্তর দিতে লাগল—

  • একজন বললেন, “লোহার বিশাল ভার”—যা মানুষের শক্তি দিয়েও সরানো যায় না।
  • আরেকজন বললেন, “পর্বতের ওজন”—যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অটল থাকে।
  • তৃতীয়জন বললেন, “সমুদ্রের গভীরতা”—যার তল পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারে না।

মাসিমা সবার কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “না। সবচেয়ে ভারী জিনিস হলো—একজন পিতার কাঁধে নিজের সন্তানের মৃতদেহ।”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কথাটা যেন সবার বুকে ছুরি চালিয়ে দিল। চোখে চোখে জলের ধারা, মনে মনে সেই কষ্টের ছবি।


মাসিমা একটু থামলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, “আজ আমরা কথা বলব দুই পিতার কথা। দুজনই হারিয়েছিলেন তাদের সন্তান। কিন্তু তারা শোককে সামলেছিলেন দুই ভিন্ন পথে। একজন হলেন মহাভারতের মহারথী অর্জুন, আরেকজন হলেন গজলের সম্রাট জগজিৎ সিং।”


প্রথম পিতা – অর্জুনের শোক

দ্বাপর যুগ। মহাভারতের মহাযুদ্ধের মাঝে এক নাম—অর্জুন। তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা, ধনুকের টঙ্কারে যিনি শত্রুদের হৃদয় কাঁপিয়ে দিতেন।

কিন্তু তার জীবনেও এল এক কালো দিন। তার প্রিয় পুত্র অভিমন্যু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের হাতে নিহত হল।

যে অর্জুন কখনো ভয়ে পিছু হটেননি, সেই অর্জুনের হৃদয় তখন ভেঙে টুকরো টুকরো। অভিমন্যুর রক্তাক্ত দেহ যখন তার সামনে এল, তখন তার চোখে শুধু ক্রোধ, মনে শুধু প্রতিশোধের আগুন। তিনি ভুলে গেলেন যুদ্ধের কৌশল, ভুলে গেলেন নিজের লক্ষ্য। শুধু জ্বলতে লাগলেন এক অন্ধ আবেগে।

তিনি শপথ নিলেন, “জয়দ্রথকে আমি সূর্যাস্তের আগে হত্যা করব, নইলে নিজেকে আগুনে জ্বালিয়ে দেব।” কিন্তু এই ক্রোধ তাকে বিভ্রান্ত করল।

শোক আর ক্রোধে তিনি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছিলেন।


শ্রীকৃষ্ণ, যিনি অর্জুনের সারথি ও পথপ্রদর্শক, হঠাৎ রেগে গেলেন। তিনি কঠোর কণ্ঠে বললেন, “তোমার এই প্রতিজ্ঞাই এখন তোমার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, অর্জুন! এখন তোমার মনোযোগ দুই দিকে বিভক্ত – একদিকে অস্তগামী সূর্য, আর অন্যদিকে তোমার শত্রু, জয়দ্রথ!”

“একজন যোদ্ধার সবচেয়ে বড় শক্তি কী জানো? তার অবিচল মনোযোগ! কিন্তু তুমি? তুমি তো নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছো! এখন তোমার লড়াই শুধু জয়দ্রথের সঙ্গে নয়, সময়ের সঙ্গেও!

কৃষ্ণের তীক্ষ্ণ বাক্যে অর্জুন চমকে উঠল। সত্যিই তো! যুদ্ধের মাঠে প্রতিজ্ঞা নয়, কৌশলই শেষ কথা বলে। কৃষ্ণ যে সহজেই হাল ছাড়বেন না, তা অর্জুনের ভালো করেই জানা ছিল!

তখন তার পথপ্রদর্শক কৃষ্ণ এগিয়ে এলেন। কৃষ্ণের চতুরতায় সূর্যাস্তের এক মায়া তৈরি হল, আর অর্জুন তার মনোযোগ ফিরে পেয়ে জয়দ্রথকে হত্যা করলেন।

এই গল্প শুধু অর্জুনের নয়। আমাদের সবার। শোক এলে আমরাও তো বিভ্রান্ত হই, ক্রোধে ভুল পথে চলে যাই। কিন্তু সত্যিকারের শক্তি আসে যখন আমরা প্রতিক্রিয়া (Reaction) ছেড়ে প্রতিস্পন্দনের (Response)পথ বেছে নিই।


Please watch the video to get the real feeling


দ্বিতীয় পিতা – জগজিৎ সিংয়ের সুর

এবার আসি আধুনিক যুগে। জগজিৎ সিং—গজলের সম্রাট, যার কণ্ঠে মিশে আছে হৃদয়ের গভীরতম আবেগ।

কিন্তু ১৯৯০ সালে তার জীবনে এল এক মর্মান্তিক দিন। তার একমাত্র পুত্র বিবেক, মাত্র ২১ বছর বয়সে, এক সড়ক দুর্ঘটনায় চিরতরে চলে গেল।

একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের দেহ চিতায় তুলে দেয়, তখন তার হৃদয়ে যে ঝড় ওঠে, তা কি কখনো শান্ত হয়? জগজিৎের স্ত্রী চিত্রা সিংও এই শোক সইতে না পেরে জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সবাই ভেবেছিল, জগজিৎ আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন না।

কিন্তু তিনি ধ্বংস হয়ে যাননি, হার মানেননি। বরং, তিনি তার দুঃখকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে আরও গভীর, আরও আবেগময় সংগীত সৃষ্টি করতে শুরু করলেন।

জগজিৎ সিং তার গানের মাধ্যমে নিজের যন্ত্রণাকে এমনভাবে প্রকাশ করলেন যে, সেই সংগীত আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বয়ে চলে।

Example


Chithi Na Koi Sandesh -Dushman (1998) | Kajol, Sanjay Dutt

Chithi na koi sandesh
Jaane woh kaun sa desh
Jahan tum chale gaye…”
—এই গান শুধু সংগীত নয়, এক বাবার হৃদয়ের কান্না। তিনি তার শোককে শক্তিতে বদলে, বিশ্বের সামনে তুলে ধরলেন এমন গজল, যা আজও আমাদের চোখে জল এনে দেয়, আবার মনে আশার আলোও জ্বালায়।

জগজিৎ দেখিয়ে দিলেন, শোক ধ্বংস করতে পারে না, যদি তুমি তাকে সৃষ্টির পথে নিয়ে যাও।


শিক্ষা: প্রতিক্রিয়া নয়, প্রতিস্পন্দন

মাসিমা একটু থামলেন। তারপর গভীর গলায় বললেন, “শোক আসবেই। দুর্ভাগ্য তো জীবনের অংশ। কিন্তু তুমি কীভাবে সেই শোককে সামলাবে, সেটাই তোমার জীবনকে বদলে দিতে পারে।”

  • অর্জুন প্রথমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। ক্রোধে ভরা তার শপথ তাকে বিভ্রান্ত করেছিল। কিন্তু কৃষ্ণের কথায় তিনি বুঝলেন, প্রতিশোধ নয়, কর্তব্যই তার পথ। তিনি মনোযোগ ফিরিয়ে আনলেন, আর জিতলেন।
  • জগজিৎ সিং শোকে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি হার মানলেন না। তিনি তাঁর দুঃখকে সংগীতে ঢেলে দিলেন, আর সেই সুরে অমর হয়ে রইলেন।

“তাই বলো, তোমরা কী করবে?” মাসিমা সবার দিকে তাকালেন। “শোক এলে তুমি কি ক্রোধে জ্বলবে, না সেই শোককে শক্তিতে বদলে নিজের পথ খুঁজবে?”


শেষের হাসি

এই গল্প শুনে ঘরের সবাই চুপ করে গেল। তাদের চোখে জল, কিন্তু মনে একটা নতুন ভাবনা জেগে উঠল। তারা বুঝতে পারল, প্রতিক্রিয়া নয়, প্রতিস্পন্দনই জীবনের আসল চাবিকাঠি।

কেউ একজন ধীরে বলে উঠল, “মাসিমা, আমরাও কি পারব?”
মাসিমা কিছু বললেন না। শুধু তার মুখে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। যেন বলতে চাইলেন, “পথ তোমাদের হাতে। তুমিই বেছে নাও।”