Corporate Daduji

A Corporate Daduji’s Creation

Competency Mapping

“দ্রোণাচার্যের গোপন শিক্ষা: শক্তি খোঁজার মন্ত্র” মাসিমার ঝুলি


রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করছে তারারা। চারপাশে নীরবতা। মাসিমা মাদুর পেতে বসে আছেন, আর তার চারপাশে বাচ্চাদের চোখে-মুখে কৌতূহল ঝিলিক দিচ্ছে। বড়রাও একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুনছে। মাসিমা গভীর গলায় বললেন—

আজ তোমাদের শোনাবো এমন এক গোপন মন্ত্র, যা জানলে তোমার জীবন বদলে যেতে পারে। কিন্তু এই রহস্য জানতে হলে মন দিয়ে শুনতে হবে। একটুও নড়াচড়া নয়!”

সবার মনে যেন ঝড় উঠল—গোপন মন্ত্র? কৌতূহলে সবাই গা ছমছম করতে লাগল।

মাসিমা ধীরে ধীরে শুরু করলেন,
অনেক, অনেক দিন আগে ভারতবর্ষে ছিল এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা আমাদের আজকের পৃথিবী ভুলে গেছে। কিন্তু সেই শিক্ষা ছিল সবচেয়ে উন্নত। এর নাম ছিল গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থা।

একটা ছোট্ট ছেলে বলল, কী ছিল ওই শিক্ষায়, মাসিমা?”

মাসিমা চোখে রহস্যের আলো জ্বালিয়ে বললেন,
গুরুকুলে প্রতিটি ছাত্রকে প্রথমে পরীক্ষা করা হতো। গুরু তাদের দেখে, শুনে, বুঝে তাদের শক্তি আর দুর্বলতা খুঁজে বের করতেন। একে বলে Competency Mappingযে যার যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষিত হতো। ঠিক যেমন একটা হাতিকে বলা হতো না আকাশে উড়তে, আর নদীর মাছকে বলা হতো না গাছে উঠতে।

সবাই যেন গভীর ভাবে শুনছে। এবার মাসিমা বললেন,
মহাভারতের কথা মনে পড়ে? সেই দ্রোণাচার্যের গুরুকুল। তিনি জানতেনএকেকজনের ক্ষমতা একেকরকম। সবাইকে একই পড়া শেখালে কেউই সফল হতে পারবে না। তাই তিনি সবার শক্তি চিহ্নিত করতেন আর সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতেন।

একটু থেমে মাসিমা উত্তেজনা এনে বললেন—

  • অর্জুন ছিল তীক্ষ্ণ চোখের ছেলে। দ্রোণাচার্য বুঝলেন, এই ছেলে সেরা তিরন্দাজ হতে পারে। তাই তাকে বানালেন বিশ্বের সেরা তিরন্দাজ।
  • ভীম ছিল বিশাল আর শক্তিশালী। তার জন্য গদা যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। তাই তাকে বানানো হলো গদার অজেয় যোদ্ধা।
  • নকুল ছিল দ্রুতগতি আর তীক্ষ্ণ। তার হাতে তলোয়ার মানিয়ে গেলো ঠিক যেমন বিদ্যুৎ মেঘের মধ্যে খেলে।
  • আর যুধিষ্ঠির? তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল আর ন্যায়পরায়ণ। তাই দ্রোণাচার্য তাকে দিলেন রাজধর্মের শিক্ষা।

একটা ছেলে অবাক হয়ে বলল, তাহলে সবাইকে তো আলাদা শেখানো হতো!”

মাসিমা মুচকি হেসে বললেন,
ঠিক ধরেছিস। কারণ গুরু জানতেন, সবাইকে এক মাপে ফেলা যায় না। যেমন মাছকে গাছে ওঠার শিক্ষা দিলে সে মারা যাবে। হাতিকে গাছে ওঠাতে বললে সে ব্যর্থ হবে। কিন্তু সেই হাতি যদি তার শুঁড় দিয়ে গাছের ফল তোলে, তখন কি তাকে কেউ হারাতে পারবে?”

বাচ্চারা যেন শ্বাস বন্ধ করে শুনছে। মাসিমা বললেন,

গুরুকুলের শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছিল, সবার জন্য একটাই পথ নেই। প্রত্যেকের নিজস্ব একটা শক্তি আছে। একজন গাছে ওঠার মাস্টার, আরেকজন জলে সাঁতার কাটার রাজা। আর সেই শক্তিটা খুঁজে বের করাই গুরুদের কাজ ছিল।

একটা মেয়ে বলল, এখন তো সবাইকে একই রকম পড়তে হয়, মাসিমা!”

মাসিমার গলায় এবার ব্যথা ঝরে পড়লো। তিনি বললেন—

এই জন্যই তো আজ এত হতাশা। আজ সবাইকে একই রকম দৌড় করানো হয়। যে হাঁস সাঁতারে সেরা, তাকে যদি দৌড়ে নামানো হয়, সে কি জিততে পারবে? তাই আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মন্ত্রে—Competency Mapping

সবাই চুপ। যেন তাদের চোখের সামনে নতুন একটা দরজা খুলে গেছে।

মাসিমা এবার গলা নিচু করে বললেন,
তোমাদেরও সেই শক্তিটা খুঁজতে হবে। কে জানে, তুমি অর্জুনের মতো লক্ষ্যভেদ করায় সেরা, কিংবা নকুলের মতো দ্রুতগতি। হয়তো তোমার মধ্যে লুকিয়ে আছে ভীমের মতো শক্তি বা যুধিষ্ঠিরের মতো ধৈর্য। সেটা খুঁজে বের করো। আর মনে রেখো, সবার ক্ষমতা আলাদা। সেই ক্ষমতাকে সঠিক পথে চালনা করলে তুমিও সেরা হবে।

সবাই চুপ। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন—আমার শক্তি কী? আমি কোন পথে এগোব?”

মাসিমা এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
যেদিন নিজের শক্তি খুঁজে পাবে, সেদিন তুমিও বিশ্ব জয় করবে। আর সবাই বলবেএটাই আমার সন্তান, এটাই আমার গর্ব।

গল্প শেষ। কিন্তু চারপাশে যেন নতুন আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই মনে মনে ভাবছে—আমার শক্তি কী? আমি কোন বিষয়ে সেরা?”

আর মাসিমা মুচকি হেসে বললেন,
নিজের ভেতর সেই প্রশ্নটা রেখে দাও। উত্তর একদিন নিজেই খুঁজে পাবে। আর সেদিন তুমিও আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে।

গল্পের রেশ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, আজ একটা বড় শিক্ষা তারা পেয়ে গেলো। সবার জন্য এক শিক্ষা নয়। নিজের শক্তি খুঁজে নিজেই নিজের পথ তৈরি করো।