বিদ্রোহী কবিতা — শব্দার্থ ও টীকা
আমি চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ,
আমি দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম্
ভরপুর মদ।
দুর্ম্মদ — মত্ত, উদ্ধত, প্রবল আত্মশক্তিতে উন্মত্ত।
দুর্দ্দম — যাকে দমন করা যায় না, অপ্রতিরোধ্য।
হর্দ্দম্ (হরদম) — সর্বদা, প্রতি মুহূর্তে (ফারসি-উর্দু উৎসের শব্দ)।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!
হোম-শিখা — যজ্ঞে অগ্নিকুণ্ডে জ্বলতে থাকা পবিত্র অগ্নিশিখা।
সাগ্নিক — অগ্নিসহ, অগ্নিধারী; যিনি পবিত্র অগ্নি রক্ষা করেন।
জমদগ্নি — হিন্দু পুরাণের মহর্ষি জমদগ্নি; পরশুরামের পিতা এবং তেজ, তপস্যা ও ক্রোধের প্রতীক।
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য,
মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য।
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
ইন্দ্রাণি-সূত — ইন্দ্রাণীর পুত্র; এখানে সাধারণভাবে জয়ন্ত-কে বোঝায়, যিনি দেবরাজ ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণীর পুত্র।
চাঁদ ভালে — কপালে চাঁদ ধারণকারী।
এটি ভগবান শিবের একটি বিশেষ পরিচয়। পুরাণ অনুসারে শিব তাঁর জটাজুটের উপর বা কপালে অর্ধচন্দ্র ধারণ করেন। তাই তাঁকে “চন্দ্রশেখর”, “শশাঙ্কশেখর” বা “চন্দ্রভাল” বলা হয়।

https://www.youtube.com/watch?v=WxNclD0-rfY
বাঁকা বাঁশের বাঁশরী — শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি; প্রেম, সুর ও মাধুর্যের প্রতীক।
রণ-তূর্য্য — যুদ্ধের শিঙ্গা বা বিগুল; সংগ্রাম ও যুদ্ধের আহ্বানের প্রতীক।
কৃষ্ণ-কণ্ঠ — নীলকণ্ঠ শিব; সমুদ্র মন্থনের বিষ পান করে যার কণ্ঠ নীল হয়েছিল।
মন্থন-বিষ — সমুদ্র মন্থনের সময় উৎপন্ন কালকূট বিষ।
ব্যথা বারিধির — ব্যথার সমুদ্র; অসীম দুঃখ ও যন্ত্রণার প্রতীক।
ব্যোমকেশ — আকাশকে কেশরূপে ধারণকারী; ভগবান শিবের একটি নাম।
গঙ্গোত্রী — হিমালয়ের সেই স্থান যেখানে গঙ্গার উৎপত্তি।
নীলকণ্ঠ (কৃষ্ণ-কণ্ঠ)
সমুদ্র মন্থনের সময় উৎপন্ন কালকূট বিষ পৃথিবীকে ধ্বংস করতে উদ্যত হলে শিব তা পান করেন। বিষের প্রভাবে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়। তাই তিনি নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত।
ব্যোমকেশ
ব্যোম অর্থ আকাশ, কেশ অর্থ চুল। শিবের জটাজুট আকাশব্যাপী বলে তাঁকে ব্যোমকেশ বলা হয়।
গঙ্গাধারণ
পুরাণ অনুসারে স্বর্গ থেকে নেমে আসা গঙ্গার প্রবল স্রোত পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারত। শিব তাঁর জটায় গঙ্গাকে ধারণ করে সেই স্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।
সরলার্থ
আমি এমন এক সত্তা যার কপালে চাঁদ ও সূর্যের দীপ্তি বিরাজমান। আমার এক হাতে কৃষ্ণের প্রেমময় বাঁশি, আর অন্য হাতে যুদ্ধের আহ্বানকারী তূর্য।
আমি নীলকণ্ঠ শিবের মতো পৃথিবীর দুঃখ ও বিষ নিজের মধ্যে ধারণ করি।
আমি ব্যোমকেশ শিবের মতো মুক্ত গঙ্গাধারাকে ধারণ করে রাখি।