Corporate Daduji

A Corporate Daduji’s Creation

Murshidabad Series– 7

সিরিজ: আমার মুর্শিদাবাদ – সপ্তম পর্ব


🎙️ বন্ধুরা,
আমরা তো ছোটবেলায় শুনেছি —
সম্রাট শাহজাহান বানিয়েছিলেন তাজমহল,
তার স্ত্রী মুমতাজের স্মৃতিতে।
তাজমহল আজো দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসার এক অবিনশ্বর প্রতীক হয়ে।
চোখ আটকে যায় তার নির্মাণশৈলীতে,
আর মন ডুবে যায় সেই এক চিরন্তন প্রেমে…

কিন্তু…
এই বাংলার বুকে,
এই মাটির গভীরে,
মুর্শিদাবাদের এক কোণে,
নীরব নদীর পাড়ে লেখা হয়েছে আরেকটি প্রেমের গল্প…
আর তার নাম — হীরাঝিল প্রাসাদ।

এটা ছিলো একটা স্বপ্ন…
এক রাজপুত্রের প্রেম,
এক নবাবের সৌন্দর্যবোধ,
এক স্বপ্নবিলাসীর নিঃশব্দ অঙ্গীকার —
ভালোবাসা যেন শুধু স্মৃতিতে না থেকে যায়,
তার জন্য গড়ে উঠুক এক স্থায়ী প্রাসাদ।

হীরাঝিল —
যেখানে জ্যোৎস্নার রাতে,
ঝিলের জলে পড়তো প্রাসাদের প্রতিবিম্ব,
আর মনে হতো — সময় যেন থেমে গেছে…
যেন প্রেম, রাজনীতি আর সৌন্দর্য একসাথে গান গাইছে…

এখানেই নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা আর লুৎফুন্নেসার গল্প —
প্রেম, বেদনা আর ইতিহাসে জড়িয়ে থাকা দুটি প্রাণ…
এখানেই বসে নবাব ভাবতেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন,
আর লুৎফু তাকিয়ে থাকতেন প্রাসাদের জানালা দিয়ে —
ঝিলের জলে চাঁদের আলো ভেঙে পড়ছে,
আর হৃদয় জেগে উঠছে এক নীরব প্রেমে…


🏰 “হীরাঝিল প্রাসাদের জন্মগাঁথা”।

📜 সময়টা তখন ১৭৪০-এর দশক।
বাংলার মসনদে তখন এক দূরদর্শী শাসক — নবাব আলীবর্দী খাঁ।
তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ বা যোদ্ধাই ছিলেন না —
তিনি ছিলেন এক প্রজ্ঞাবান দাদু,
যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে জানতেন।

🌱 তাঁর প্রিয় নাতি, তখনো বালক — সিরাজউদ্দৌলা।
তবে আলীবর্দী খাঁ বুঝেছিলেন,
“এই ছেলেটিই একদিন হয়ে উঠবে বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা।”
আর তাই, তাঁর জন্য গড়তে চেয়েছিলেন এক স্বপ্নপুরী


📍 স্থান নির্বাচিত হয় এক নির্জন, নিঃশব্দ প্রান্তরে —

শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, ভাগীরথী নদীর শান্ত তীরে,

লালবাগ শহরের ঠিক বিপরীত পাড়ে।

সে সময় এই অঞ্চল ছিল প্রায় জনমানবশূন্য —

নদীর পাড়ে ভেসে আসত শুধু পাখির ডাক,বাতাসের হালকা দোলা, আর প্রকৃতির নিঃশব্দ আলিঙ্গন, নদীর মৃদু কলকল ধ্বনি,আর বাতাসে ঘুরে বেড়ানো এক গভীর স্বপ্নের প্রতীক্ষা —

এক ভবিষ্যৎ নবাবের জন্য নির্মিত হতে চলা এক স্বপ্নপুরীর প্রতীক্ষা।


🏗️ ঠিক এইখানেই শুরু হল —
“হীরাঝিল প্রাসাদ” নির্মাণের এক মহাগাথা।


🧱 প্রাসাদের প্রতিটি ইটে ছিল ভালোবাসার ছোঁয়া
• গৌড় থেকে আনা গাঢ় লাল পাথর

•নকশা ছিল পারস্য ঘরানার,
•আর সজ্জা — বাংলার কারিগরদের হাতে গড়া এক এক কাব্যের মত।
• দিল্লি, আগ্রা ও আরব দেশের কারিগরদের নিখুঁত হাতে তৈরি
• যেন এক জীবন্ত স্বপ্ন—
o 🏯 রাজপ্রাসাদ,
o 🕌 প্রার্থনাকক্ষ,
o 🌸 ফুলের বাগান ও ঝিল,
o 🧕 হিজাব মহল ও রান্নাঘর,
o 🏹 রণচর্চার ময়দান,
o 🎭 সংগীত ও নৃত্যের চত্বর,
o 🧾 ব্যক্তিগত পাঠাগার ও প্রশাসনিক কক্ষ।


🌕 ‘হীরাঝিল’ নাম কেন রাখা হয়েছিল?

এই নামের মধ্যে আছে রাজকীয়তা, অপূর্ব সৌন্দর্য, আর এক ধরণের কাব্যিক স্বপ্ন।

👉 “হীরা” মানে মূল্যবান রত্ন — ঠিক যেমন এই প্রাসাদটি ছিল নবাব আলীবর্দী খাঁর হৃদয়ের হীরা, তার নাতি সিরাজউদ্দৌলার জন্য নির্মিত এক দুর্লভ রত্নের মতো প্রাসাদ।

👉 আর “ঝিল” মানে একটি ছোট্ট হ্রদ বা জলাশয় —
এই প্রাসাদের পাশেই তৈরি করা হয়েছিল এক মনোরম ঝিল।
যার জলে দিনের বেলায় সূর্য আর জোছনার রাতে সেই ঝিলের জলে পুরো প্রাসাদের প্রতিবিম্ব পড়ত,
যা দেখলে মনে হতো, স্বর্গ যেন ঝিলের পাড়ে নেমে এসেছে।


📜 তাই এই প্রাসাদ শুধু স্থাপত্য নয় — ছিল এক স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি
নবাব নিজেই বলেছিলেন,

“এই ঝিল যেন হীরার মতো জ্বলজ্বল করে, আর আমার নাতির ভবিষ্যতও হোক তেমনি দীপ্তিময়।”

এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় নাম —
🌕 “হীরাঝিল”
একটা স্বপ্নপুরী,
যার প্রতিটি ইটের মাঝে লুকিয়ে ছিল
ভালোবাসা, আশীর্বাদ, আর ইতিহাসের হীরের ছটা।

হীরাঝিল প্রাসাদ এতটাই বিশাল আর মনোরম ছিল প্রাসাদটি, যে একসাথে তিনজন ইউরোপীয় রাজাও সেখানে বসবাস করতে পারতেন।


❤️ লুৎফুন্নেসা — সিরাজের প্রেয়সী।

তার জন্যই তো এই প্রাসাদ আরও বেশি প্রিয়, আরও বেশি স্বপ্নময়।
বলে না? প্রেম যখন রাজসিক হয়, তখন তার প্রতিফলনও হয় প্রাসাদের দেওয়ালে, মেঝেতে, আর ঝিলের জলে।
ওরা দু’জনে প্রায়ই বসতেন ঝিলের ধারে —
একদিকে রাজ্যশাসনের চাপে ক্লান্ত নবাব,
আরেকদিকে প্রেমিক হৃদয়ে ভরা সিরাজ,
আর মাঝখানে জ্যোৎস্না ও নিঃশব্দ জলের স্পর্শে গলে যাওয়া মুহূর্ত…

🎻 বাতাসে বাজত বংশী আর সেতারের সুর।
জোনাকিরা নাচত প্রাসাদের উঠোনে।
আর দূরে, গঙ্গার ওপারে, শোনা যেত রাতের জলের শব্দ —
যেন ইতিহাস নিজেই এক অলিখিত কবিতা হয়ে উঠে আসছে মুর্শিদাবাদের আকাশে।


🌫️ কিন্তু… সব গল্পেই তো একদিন আসে বাঁক।
সময়টা এক সময় বদলাতে শুরু করল।
রাজনীতি ঘনিয়ে এল প্রেমের চৌহদ্দিতে।
একদিকে ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র, আরেকদিকে ঘরের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা —
হীরাঝিল আর শুধু প্রেমের প্রাসাদ রইল না।
ওটা হয়ে উঠল সাক্ষী — এক পতনের, এক অশ্রুভেজা যবনের দৃশ্যপট।


📅 ১৭৫৭ সাল।
নবাব সিরাজ যখন পলাশীর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন,
তিনি ঠিক এই হীরাঝিল প্রাসাদ থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন।

⚔️ ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে,

যুদ্ধ চলাকালীনই সিরাজ বুঝতে পারেন যে মীর জাফর, রায়দুর্লভ, ওমিচাঁদ প্রমুখ তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি নিজেই যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পলায়ন করেন।

👉 তিনি দ্রুত মুর্শিদাবাদে ফিরে যান এবং দ্রুত হীরাঝিল প্রাসাদে প্রবেশ করেন।
তাঁর পরিবারকে দ্রুত সংগঠিত করে।

🔥 সেই রাতে, শেষবারের মতো প্রিয় হীরাঝিল প্রাসাদে চোখ বুলিয়ে
স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ও ছোট্ট কন্যাকে বুকে জড়িয়ে নেন নবাব।
সঙ্গে থাকেন কিছু বিশ্বস্ত অনুচর।

🏰 এই প্রাসাদে আর কোনোদিন তাঁর পা পড়েনি।

🌊 নিজস্ব এক নৌকা নিয়ে তাঁরা নামেন ভাগীরথীর জলে।
চাঁদের আলোয় নদীর ঢেউ যেন কাঁদছিল সেই রাতে…

👉 গন্তব্য — পাটনা।
সিরাজের শেষ আশ্রয়স্থল।


🕵️ কিন্তু ইতিহাস সহজে কাউকে পালাতে দেয় না…

পথে এক স্থানীয় মোঘল সৈনিক, যাকে সিরাজ বিশ্বাস করেছিলেন,
সেই মানুষই মীরনের সৈন্যদের কাছে খবর পৌঁছে দেয়।

🗡️ সিরাজ ধরা পড়েন।
মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে আনা হয় তাঁকে।


সিরাজ-উদ-দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
আর ঠিক তখনই শুরু হয় হীরাঝিলের সত্যিকারের পতন।

⚔️ ব্রিটিশ বাহিনী ও বিশ্বাসঘাতকদের হাতে
এই সুরম্য প্রাসাদ লুটপাটের শিকার হয়।
স্বর্ণ, রত্ন, চিত্রকলা—সব নিয়ে যাওয়া হয়,
আর ধীরে ধীরে প্রাসাদের প্রাণ কাড়ার কাজ শুরু হয়।

🌊 ইতিহাস বলে—
এই প্রাসাদ ধ্বংস করতে ইংরেজরা ভাগীরথীর গতিপথই বদলে দেয়।
নদী কেটে প্রাসাদের দিকে জলধারা ঘুরিয়ে আনা হয়,
যাতে প্রাসাদের ভিত্তিই ধ্বসে পড়ে!

⏳ আর আজ?
আজ শুধু কিছু ভাঙা দেওয়াল,
কিছু মাটি চাপা কান্না,
আর ভাগীরথী নদীর ক্রমাগত ভাঙন—
যা প্রতিনিয়ত গ্রাস করে নিচ্ছে হীরাঝিলের স্মৃতি।

📜 বন্ধুরা,
একদিন এই প্রাসাদ ছিল বাংলা ইতিহাসের গৌরব,
আজ তা রূপ নিয়েছে নীরব শোকগাঁথায়।
কিন্তু মনে রাখবেন—
প্রাসাদ ভাঙে, ইট ভাঙে, কিন্তু ইতিহাসের হৃদয় কখনো ভাঙে না।
যদি আমরা মনে রাখি।


বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…