মাসিমার ঝুলি: মহাভারতের ভুল ,পাণ্ডবদের সবচেয়ে বড় ভুল – যা আমাদের জীবনেও ঘটে”

মৃদু বাঁশির সুর, আকাশে চাঁদের আলো। বাতাসে যেন একটা অদ্ভুত রহস্যের গন্ধ। রাতের পাখির ডাক আর পাতার মৃদু মর্মরে পরিবেশ যেন জীবন্ত।
ছোটরা মাসিমার চারপাশে গোল হয়ে বসেছে।

মাসিমা ধীরে ধীরে বললেন, “তোমরা কি জানো, মহাভারতের সেই সময়টা, যখন পাঁচ পাণ্ডব এত শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও একটা ভুলের জন্য সব হারিয়েছিল? শুধু তাদের নয়, পুরো ভারতের ইতিহাসটাই বদলে গেল। কেন জানো?”
ছোটরা উৎসুক হয়ে বলল, “কেন, মাসিমা? কী এমন ভুল করেছিল তারা?”
মাসিমার চোখে গভীরতা। তিনি একটু থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, “এই গল্প শুধু তাদের নয়, আমাদের সবার। হয়তো আমরা বুঝতে পারি না, কিন্তু আমাদের জীবনেও সেই একই ভুল বারবার ঘটে। শুনবে?”
সবাই একসঙ্গে বলল, “হ্যাঁ, মাসিমা! শোনাও!”
[পাশার খেলায় সব হারানো]
(রাজসভায় দুর্যোধনের উচ্চ হাসি, দ্রৌপদীর কান্না, পাণ্ডবদের নত মুখ। শকুনির চোখে ধূর্ত চাহনি।)

“পাণ্ডবরা যখন হস্তিনাপুরের রাজসভায় ঢুকল, তারা জানত না, তারা কী হারাতে চলেছে। একটা পাশার খেলার জন্য শুধু তাদের রাজ্য নয়, তাদের সম্মান, তাদের ভালোবাসা—সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
দুর্যোধন আর শকুনি যখন তাদের খেলা দেখছিল, তখন তারা হেসে বুঝেছিল, পাণ্ডবরা হারবে। কারণ, তাদের সঙ্গে একজন অনুপস্থিত ছিল। কে জানো? শ্রীকৃষ্ণ।
পাণ্ডবরা নিজেদের আত্মবিশ্বাসে এতটা মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে তারা ভাবল, এই খেলা তারাই জিতবে। তারা কৃষ্ণের পরামর্শ নিল না। আর এটাই তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।”
[কৃষ্ণের গুরুত্ব: যা আমরা ভুলে যাই]
“পাণ্ডবরা সব সময় কৃষ্ণের শরণাপন্ন হতো। যুদ্ধ হোক, বা রাজ্য প্রতিষ্ঠা—তারা সব সময় কৃষ্ণের কাছে পরামর্শ নিত।
কিন্তু যখন তারা পাশার খেলায় ঢুকল, তখন তারা একাই সিদ্ধান্ত নিল। তারা ভাবল, তারা যথেষ্ট শক্তিশালী, তারা সব পারবে।
তোমরা কি জানো, ইন্দ্রপ্রস্থ তৈরির সময় কৃষ্ণ তাদের কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?
অর্জুন যখন খাণ্ডব বন জ্বালিয়ে দিতে চাইছিল, তখন কৃষ্ণ তার পাশে ছিল। তাদের মধ্যে সেই আত্মিক সংযোগ ছিল বলেই তারা জিতেছিল।
কিন্তু রাজসভায় কৃষ্ণ ছিল না। তার পরামর্শ ছাড়া পাণ্ডবরা অন্ধের মতো এগিয়ে গেল। আর তার ফল হলো ধ্বংস।”
[আজকের জীবনের গভীর শিক্ষা]
“এই গল্প কি শুধু পাণ্ডবদের? না। এই গল্প আসলে আমাদের সবার।
আমরা যখন আনন্দে থাকি, সাফল্য পাই, তখন আমরা কী করি? আমরা ভুলে যাই আমাদের আশীর্বাদ, আমাদের গাইড, এবং ঈশ্বরকে।
তোমরা কি ভেবেছ, কেন আমরা সুখে থেকেও অস্থির? কেন আমাদের দুঃখ এত তাড়াতাড়ি ধ্বংস করে দেয়? কারণ আমরা ভুলে যাই—আমাদের জীবনের সব সুখ-দুঃখে একজন সঙ্গী প্রয়োজন। একজন পথপ্রদর্শক। আর সেটা হলো ঈশ্বর, অথবা আমাদের জীবনের সেই মানুষ, যে আমাদের সত্যিকারের ভালোর কথা ভাবে।
কিন্তু আমাদের অহংকার, আমাদের আত্মবিশ্বাস, আমাদের নিজেকে সবজান্তা ভাবা আমাদের সেই পথপ্রদর্শককে দূরে সরিয়ে দেয়। আর তারপর, যখন বিপদ আসে, আমরা ভেঙে পড়ি।”
[তোমাদের জীবনের প্রশ্ন]
মাসিমা ধীরে বললেন, “বাচ্চারা, আমি তোমাদের একটা প্রশ্ন করি। ধরো, জীবনের একটা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছ। তখন তুমি কী করবে? নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি এমন কারও সঙ্গে আলোচনা করবে, যে তোমার সত্যিকারের মঙ্গল চায়?”
একটা ছেলে মাথা নিচু করে বলল, “মাসিমা, আমরা প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নিই, কারণ আমরা কাউকে জিজ্ঞাসা করতে চাই না। আমরা ভাবি, আমরা সব জানি।”
মাসিমা মুচকি হেসে বললেন, **“ঠিক। এটাই তো আমাদের ব্যর্থতার কারণ। যখন আমরা ঈশ্বর, বা আমাদের পরামর্শদাতা, বা আমাদের পরিবারকে ভুলে যাই, তখন আমাদের জীবনের রথ মাটিতে আটকে যায়।
তোমাদের জীবনে কৃষ্ণ কে?
তোমাদের পরামর্শদাতা কে? Who is your mentor ,coach?
আজ যদি সেই মানুষদের সঙ্গ হারাও, তাহলে আগামীকালের পথ হারাবে। নিজের অহংকারে ভর করে চললে, একদিন পাণ্ডবদের মতোই সব হারাবে। নিজের জীবনে সেই পথপ্রদর্শককে খুঁজে বের করো। তাকে আঁকড়ে ধরো।”**
[কেন এই শিক্ষা দরকার?]
“পাণ্ডবদের গল্প আমাদের শেখায়:
১. ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ রাখো। সুখে-দুঃখে তাকে হৃদয়ের কাছাকাছি রেখো।
২. পরামর্শ নাও। যে সত্যিকারের তোমার ভালোর কথা ভাবে, তার পরামর্শকে গুরুত্ব দাও।
৩. অহংকার এড়াও। আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো, কিন্তু অহংকার তোমার পতনের কারণ।
আজ ভারতবর্ষে আমরা সবাই এই ভুল করছি। আমরা ঈশ্বরকে ভুলে যাচ্ছি। আমাদের পরামর্শদাতাকে অবহেলা করছি। আমাদের জীবনের প্রকৃত গাইডকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। আর তার ফল? অস্থিরতা, ব্যর্থতা আর দুঃখ।”
[Key Takeaways]

( কৃষ্ণের বাঁশি বাজছে। মৃদু হাওয়ায় প্রদীপের আলো কাঁপছে।)
মাসিমা ধীরে ধীরে বললেন,
**“তোমাদের জীবনের পাশার খেলা অবশ্যম্ভাবী। জীবনে ভালো সময় আসবে, খারাপ সময়ও আসবে। কিন্তু যদি তোমার পাশে কৃষ্ণ থাকে, তোমার পথপ্রদর্শক থাকে, তবে কোনো খেলা, কোনো যুদ্ধই তোমাকে হারাতে পারবে না।
তাই বাচ্চারা, কখনো ঈশ্বরকে ভুলে যেও না। কখনো নিজের গাইডকে দূরে সরিয়ে দিও না। আর কখনো অহংকারে ভর করে চলতে যেও না।
মনে রেখো, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সঠিক পরামর্শ আর আত্মিক সংযোগই তোমাকে সাফল্য এনে দেবে।”**
শেষে বাঁশির সুর ধীরে ধীরে মিশে যায়। সবাই যেন গভীর চিন্তায় ডুবে থাকে। মাসিমার গল্প যেন তাদের ভেতর এক নতুন আলো জ্বেলে দিয়ে যায়।
