কলিযুগের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে ভয়ংকর চিহ্ন
একদিন ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেব—
চার ভাই একসঙ্গে এসে উপস্থিত হলেন শ্রীকৃষ্ণ–এর কাছে।
(সেই সময় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।)
চার ভাইয়ের চোখে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
যেন তারা বুঝে গিয়েছিল—
যুদ্ধ শেষ হয়েছে ঠিকই,
কিন্তু সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ এখনো শুরু বাকি।
তারা প্রণাম করে বললেন—
“হে মাধব,
কলিযুগ দ্রুত এগিয়ে আসছে।
আমাদের বলুন—
সে যুগ কেমন হবে?”

শ্রীকৃষ্ণ মৃদু হেসে উঠলেন।
সে হাসিতে ছিল আশ্বাস,
আবার গভীর এক সতর্কবার্তাও।
তিনি বললেন—
“আমি শুধু তোমাদের কলিযুগের কথা বলব না।
আমি তোমাদের কলিযুগ দেখাবো।
কিন্তু তার আগে—
তোমাদের একটি কাজ করতে হবে।”
এই বলে শ্রীকৃষ্ণ চার দিকের দিকে
পরপর চারটি তীর নিক্ষেপ করলেন।
চারটি তীর ছুটে গেল চারদিকে—
চার দিক,
চার সময়,
চারটি ভিন্ন ভবিষ্যতের পথে।
তারপর শ্রীকৃষ্ণ বললেন—
“তোমরা চারজন চার দিক থেকে
একটি করে তীর এনে দাও।
আর যেখানে তীরটি পড়বে,
সেখানে যা কিছু অদ্ভুত, বিস্ময়কর
অথবা ভয়ংকর দৃশ্য দেখবে—
সবকিছু আমাকে এসে জানাবে।”
এই কথা শুনে
ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেব
চারদিকে রওনা দিলেন—
সময়কে জানতে,
ভবিষ্যৎকে ছুঁতে,
আর কলিযুগকে চোখে দেখার জন্য।
🏹দ্বিতীয় তীর — ভীম যা দেখলেন
ভীম দ্বিতীয় তীরের খোঁজে রওনা দিলেন।
কিছুদূর এগোতেই তিনি দেখতে পেলেন—
তীরটি পড়ে আছে এক অদ্ভুত জায়গায়।
সেখানে ছিল পাঁচটি কূপ।
👉 চারদিকে থাকা চারটি কূপ—
জলে টইটম্বুর।
মিষ্টি জল উপচে পড়ছে।
যেন কখনো কোনো অভাব ছিল না।
কিন্তু—
👉 ঠিক মাঝখানে থাকা পঞ্চম কূপটি—
ভয়ংকরভাবে শুকনো।
এক ফোঁটা জল নেই।
মাটি ফেটে চৌচির।
ভীম বিস্মিত হয়ে চারপাশে তাকালেন।
চারদিকে প্রাচুর্য,
আর মাঝখানে শূন্যতা।
জল আছে—
কিন্তু সমান নয়।
সম্ভাবনা আছে—
কিন্তু ভাগাভাগি নেই।
ভীম বুঝলেন—
জলের অভাব এখানে আসল সমস্যা নয়।
সমস্যা হলো—
চারটি কূপ নিজের জল
মাঝের কূপের সঙ্গে ভাগ করেনি।
এই দৃশ্য দেখে
ভীমের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
তিনি তীর তুলে নিলেন
আর নীরবে ফিরে চললেন
শ্রীকৃষ্ণের কাছে।
ভীম তার দেখা দৃশ্য বর্ণনা করলেন।
সব কথা শোনার পর
শ্রীকৃষ্ণ মৃদু হাসলেন।
শ্রীকৃষ্ণ বললেন—
“এটাই কলিযুগের দ্বিতীয়
ও সবচেয়ে ভয়ংকর চিহ্ন।”
চারটি কূপ ভরা থাকার পরও
যদি মাঝখানের কূপ শুকিয়ে যায়—
তা জলাভাব নয়,
তা লোভ।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
“কলিযুগে সম্পদের অভাব হবে না।
জ্ঞান, শক্তি, সুযোগ—
সবই থাকবে।
কিন্তু তা চারদিকে থাকবে,
মাঝখানে পৌঁছাবে না।
একজন মানুষ পাঁচ জনের জল আটকে রাখবে,
তারপর বলবে—
‘আমি দায়ী নই, সিস্টেমই এমন।’”
শ্রীকৃষ্ণ একটু থামলেন।
তারপর বললেন—
“যখন চারজন বাঁচতে পারলেও
একজন ইচ্ছাকৃতভাবে শুকিয়ে যায়—
তখনই সমাজ ভেঙে পড়ে।
কারণ—
সেই শূন্য কূপটাই একদিন সব কূপকে গ্রাস করে।”
ভীম নীরবে মাথা নোয়ালেন।
শ্রীকৃষ্ণ শেষ করে বললেন—
“কলিযুগে সবচেয়ে বড় পাপ
হবে না চুরি,
হবে না হিংসা—
সবচেয়ে বড় পাপ হবে
থাকার পরও না দেওয়া।”
কলিযুগে অনেকের কাছে থাকবে
নিজের প্রয়োজনের বহু গুণ বেশি সম্পদ।
এত বেশি,
যে সেই অতিরিক্ত অংশ
তার নিজের কোনো কাজেই লাগবে না।
তবুও—
👉 সে তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করবে না
👉 সে তা আটকে রাখবে
👉 সে তা পাহারা দেবে
👉 সে তা জমিয়ে রাখাকে নিরাপত্তা ভাববে
অতিরিক্ত সম্পদ
তার শক্তি হবে না,
তার ভয় হয়ে উঠবে।
সে ভাববে—
“দিলে কমে যাবে।”
“আরো দরকার হতে পারে।”
“আমি কষ্ট করে পেয়েছি।”
শ্রীকৃষ্ণ বললেন—
“এই না দেওয়াই
কলিযুগের আসল হিংসা।
কারণ এতে
কারও হাত ভাঙে না,
কিন্তু ভবিষ্যৎ ভেঙে যায়।
কারও রক্ত ঝরে না,
কিন্তু সমাজ ধীরে ধীরে
শুকিয়ে যায়—
ঠিক সেই মাঝের কূপটার মতো।”
তিনি শেষবারের মতো বললেন—
“সম্পদ পাপ নয়।
অধিকার পাপ নয়।
পাপ তখনই শুরু হয়,
যখন প্রাচুর্যের পাশে দাঁড়িয়ে
তুমি অন্যের শূন্যতাকে
দেখেও না দেখার ভান করো।”
চার ভাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারা বুঝে গেলেন—
কলিযুগে দান কেবল মহৎ কাজ নয়,
এটাই হবে মানুষের শেষ পরীক্ষা।