মাস্টারদা সূর্য সেন — যে শিক্ষক সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন
ইতিহাসে অনেক শিক্ষক এসেছেন।
কেউ ছাত্রদের অঙ্ক শিখিয়েছেন।
কেউ ভাষা শিখিয়েছেন।
কেউ বিজ্ঞান শিখিয়েছেন।
কিন্তু খুব কম শিক্ষকই আছেন, যাঁরা তাঁদের ছাত্রদের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে শিখিয়েছেন।
মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন তেমনই একজন শিক্ষক।
একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক।
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল অসাধারণ।
তাঁর হাতে ছিল না কোনো সেনাবাহিনী।
ছিল না কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা।
ছিল না কোনো বিপুল অর্থসম্পদ।
তবুও তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এমন এক আঘাত হেনেছিলেন, যার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ভারতবর্ষে।
আজ যখন আমরা স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসেবে বেঁচে আছি, তখন হয়তো কল্পনাও করতে পারি না—
এক সময় এই দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাটাও ছিল অপরাধ।
আর সেই অপরাধে যারা অভিযুক্ত হয়েছিল, তাঁদের একজন ছিলেন সূর্য সেন।
কেন তাঁকে “মাস্টারদা” বলা হতো?
১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ।
চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন সূর্যকুমার সেন।
পিতা রমণীরঞ্জন সেন ছিলেন একজন সাধারণ শিক্ষক।
ছোটবেলা থেকেই সূর্য সেনের মধ্যে ছিল দেশপ্রেম, ন্যায়বোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মানসিকতা।
পরবর্তীকালে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।
ছাত্ররা তাঁকে ভালোবেসে ডাকত—
“মাস্টারদা”।
কিন্তু তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষক ছিলেন না।
তিনি ছিলেন আদর্শের শিক্ষক।
সাহসের শিক্ষক।
দেশপ্রেমের শিক্ষক।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়।
শিক্ষা মানুষকে স্বাধীন এবং সচেতন করে তোলার জন্য।
আর এই বিশ্বাসই তাঁকে ধীরে ধীরে বিপ্লবের পথে নিয়ে যায়।
গান্ধীর পথ নয়, সশস্ত্র সংগ্রামের পথ
সেই সময় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নানা ধারায় প্রবাহিত হচ্ছিল।
কেউ অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন।
কেউ রাজনৈতিক আলোচনায়।
আবার কেউ বিশ্বাস করতেন সশস্ত্র বিপ্লবে।
সূর্য সেন ছিলেন তৃতীয় ধারার মানুষ।
তিনি মনে করতেন—
যে সাম্রাজ্য বন্দুক দিয়ে শাসন করে, তাকে শুধু আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে পরাজিত করা কঠিন।
তাই তিনি গোপনে তরুণদের সংগঠিত করতে শুরু করেন।
তাঁর চারপাশে জড়ো হতে থাকেন একদল সাহসী যুবক-যুবতী।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন—
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার,
কল্পনা দত্ত,
অনন্ত সিং,
গণেশ ঘোষ,
লোকনাথ বল—
এবং আরও অনেকে।
তাঁরা শুধু বিপ্লবী ছিলেন না।
তাঁরা ছিলেন একটি স্বপ্নের সৈনিক।
স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন।
একটি অসম্ভব পরিকল্পনা
১৯৩০ সাল।
সূর্য সেন এবং তাঁর সহযোদ্ধারা এমন একটি পরিকল্পনা করলেন, যা শুনে অনেকেই বলেছিল—
“এটা অসম্ভব।”
পরিকল্পনা ছিল—
চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার দখল করা।
টেলিগ্রাফ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা।
রেলপথ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
এবং অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করা।
শুনতে যেন কোনো সিনেমার গল্প।
কিন্তু এটি ছিল বাস্তব।
আর এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক।
একজন মানুষ, যাঁকে তাঁর ছাত্ররা “মাস্টারদা” বলে ডাকত।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল।
সেই ঐতিহাসিক রাত এসে গেল।
আর সেই রাতে যা ঘটেছিল, তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বুঝিয়ে দিয়েছিল—
ভারতের স্বাধীনতার আগুন নিভে যায়নি।
বরং আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
সেই রাত ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছে—
“চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন”
নামে।
আর সেই ঘটনাই মাস্টারদা সূর্য সেনকে অমর করে তুলেছিল।
কিন্তু অস্ত্রাগার দখল ছিল শুধু শুরু।
এরপর শুরু হবে এক দীর্ঘ পলাতক জীবন।
বিশ্বাসঘাতকতা।
গ্রেপ্তার।
নির্মম নির্যাতন।
এবং এমন এক আত্মত্যাগ, যা আজও শিহরণ জাগায়।
কারণ মাস্টারদার গল্প শুধু একটি অভিযানের গল্প নয়।
এটি আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করার গল্প।
(চলবে…)