যে মানুষটি নেতাজির আগেই আজাদ হিন্দ ফৌজের স্বপ্ন দেখেছিলেন
ইতিহাসের কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন এতটাই রোমাঞ্চকর, এতটাই সাহসিকতায় ভরা যে বাস্তবের গল্পকেও কল্পকাহিনি মনে হয়।
আজ আমি শুরু করতে চলেছি আমাদের নতুন Web Series—
“বাংলার কিংবদন্তিদের খোঁজে”

আর এই সিরিজের প্রথম পর্বে আমরা পরিচিত হব এমন একজন মানুষের সঙ্গে, যার জীবন শুধু ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস নয়।
এটি এক অদম্য মানসিক শক্তি, অসীম সাহস এবং সর্বত্যাগী দেশপ্রেমের ইতিহাস।
কিন্তু তাঁর নাম প্রকাশ করার আগে আমি আপনাদের একটা প্রশ্ন করতে চাই—
আপনাদের মধ্যে কতজন উত্তম কুমারের কালজয়ী দেশাত্মবোধক চলচ্চিত্র “সব্যসাচী” দেখেছেন?

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস “পথের দাবী”-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই সিনেমায় উত্তম কুমারের অভিনীত রহস্যময় বিপ্লবী চরিত্র “সব্যসাচী” আজও বাঙালির মনে কিংবদন্তি হয়ে আছে।

কিন্তু জানেন কি?
বাংলা সাহিত্যের বহু গবেষকের মতে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই অসাধারণ চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আংশিকভাবে একজন বাস্তব বিপ্লবীর জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন।
একজন মানুষ—
যিনি ছিলেন একাধারে বিপ্লবী,
সংগঠক,
বহুভাষাবিদ,
ছদ্মবেশের ওস্তাদ,
এবং সর্বোপরি এক আন্তর্জাতিক বিপ্লবের স্বপ্নদ্রষ্টা।
একজন মানুষ,
যাঁকে ধরার জন্য ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বছরের পর বছর চেষ্টা করেছে।
একজন মানুষ,
যিনি নেতাজির বহু আগেই স্বাধীন ভারতের জন্য একটি জাতীয় সেনাবাহিনীর স্বপ্ন দেখেছিলেন।
আর সেই মানুষটি হলেন—
রাসবিহারী বসু

আজকের পর্বে আমরা জানব তাঁর অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনি, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর স্বপ্ন এবং সেই অসামান্য অবদানের কথা, যা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে।
চলুন, শুরু করা যাক।
প্রতিটি বিপ্লবীর গল্প শুরু হয় কোনো বন্দুক দিয়ে নয়।
শুরু হয় একটি স্বপ্ন দিয়ে।
একটি প্রশ্ন দিয়ে।
কিংবা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র এক প্রতিবাদ দিয়ে।
রাসবিহারী বসুর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
১৮৮৬ সালের ২৫শে মে।
বর্ধমান জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম—
সুবলদহ।
আজও সেই গ্রামের মাটিতে ছড়িয়ে আছে তাঁর স্মৃতি।
সেই গ্রামেরই পশ্চিমপাড়ার একটি বিষ্ণুমন্দিরের কাছে জন্মগ্রহণ করেন ভবিষ্যতের এই কিংবদন্তি বিপ্লবী।
পিতা ছিলেন বিনোদবিহারী বসু এবং মাতা ভুবনেশ্বরী দেবী।
কৃষ্ণমন্দিরের আশেপাশে জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর দাদু কালিচরণ বসু কৃষ্ণের আরেক নাম অনুসারে তাঁর নাম রাখেন
রাসবিহারী।
তখন কেউ জানত না,
এই ছোট্ট শিশুটি একদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঘুম কেড়ে নেবে।
গ্রামের পাঠশালা থেকে বিপ্লবের পাঠ
রাসবিহারীর প্রথম শিক্ষাজীবন শুরু হয় সুবলদহের গ্রাম্য পাঠশালায়।
আজ সেই বিদ্যালয়ের নাম—
সুবলদহ রাসবিহারী বসু প্রাথমিক বিদ্যালয়।
কিন্তু তাঁর প্রকৃত শিক্ষা শুধু বই থেকে আসেনি।
এসেছিল গল্প থেকে।
দেশপ্রেমের গল্প।
ত্যাগের গল্প।
বীরত্বের গল্প।
তাঁর দাদু কালিচরণ বসু এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি শুনতেন দেশের গৌরবময় ইতিহাস, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং বিদেশি শাসনের অত্যাচারের কথা।
সেই গল্পগুলো ধীরে ধীরে তাঁর কিশোর মনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
খেলতে খেলতেই বিপ্লব
ছোটবেলায় রাসবিহারীর একটি অদ্ভুত খেলা ছিল।
তিনি ইংরেজদের মূর্তি তৈরি করতেন।
তারপর লাঠিখেলার কৌশলে সেই মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলতেন।
শুনতে হয়তো শিশুসুলভ দুষ্টুমি মনে হতে পারে।
কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক ভবিষ্যৎ বিপ্লবীর মানসিকতা।
অন্য বাচ্চারা যেখানে শুধু খেলছিল,
সেখানে রাসবিহারী নিজের অজান্তেই প্রতিবাদের ভাষা শিখছিলেন।
ডাংগুলি খেলতেও তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন।
গ্রামের মাঠে ছুটে বেড়ানো সেই ছেলেটিই একদিন গোটা ভারতবর্ষে ছুটে বেড়াবেন স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে।
শিমলা থেকে দেরাদুন
রাসবিহারীর পিতা কর্মসূত্রে উত্তর ভারতে থাকতেন।
তাই শৈশবের পর তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বাংলার বাইরে।
তিনি পড়াশোনা করেন সুবলদহ পাঠশালা, মর্টন স্কুল এবং ডুপ্লে কলেজে।
পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের পথ তাঁকে নিয়ে যায় দেরাদুনে।
সেখানে তিনি বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে হেড ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বাইরে থেকে দেখলে তিনি একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে?
তিনি তখন এক আগ্নেয়গিরি।
যার বিস্ফোরণ এখনও বাকি।
দেরাদুনে গড়ে উঠল এক গোপন নেটওয়ার্ক
দেরাদুনে থাকাকালীন তিনি বাংলা, পাঞ্জাব এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন।
তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে চলছিল।
কেউ বাংলায় লড়ছে।
কেউ পাঞ্জাবে।
কেউ মহারাষ্ট্রে।
রাসবিহারীর অসাধারণ দূরদৃষ্টি ছিল এখানে।
তিনি বুঝেছিলেন—
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়তে হলে গোটা ভারতবর্ষকে এক সূত্রে বাঁধতে হবে।
এই চিন্তাধারা তাঁকে অন্য অনেক বিপ্লবীর থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তিনি শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না।
তিনি ছিলেন একজন সংগঠক।
একজন কৌশলী পরিকল্পনাকারী।
সেই মানুষ, যাকে ব্রিটিশরা ধরতে পারেনি
১৯১২ সালে দিল্লিতে ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের উপর বোমা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে রাসবিহারী বসুর নাম জড়িয়ে পড়ে।
তাঁর নির্দেশনাতেই তরুণ বিপ্লবী বসন্তকুমার বিশ্বাস ঐতিহাসিক বোমা নিক্ষেপ করেন।
এরপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ধরার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
তবুও—
তিনি ধরা পড়েননি।
কখনও শিক্ষক।
কখনও কর্মচারী।
কখনও ভদ্রলোক।
কখনও সাধারণ পথিক।
প্রতিবারই নতুন পরিচয়ে তিনি পুলিশের চোখ এড়িয়ে যান।
এ যেন বাস্তবের এক “সব্যসাচী”।
হয়তো সেই কারণেই পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্রের কালজয়ী বিপ্লবী চরিত্র সব্যসাচীর মধ্যে অনেকেই রাসবিহারী বসুর ছায়া দেখতে পান।
কিন্তু ভারতের মাটিতে তাঁর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।
তিনি জানতেন—
দেশে থাকলে ফাঁসি প্রায় নিশ্চিত।
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন তখনও বেঁচে ছিল।
তাই ১৯১৫ সালের ১২ই মে খিদিরপুর বন্দর থেকে জাপানি জাহাজ সানুকি-মারু-তে চেপে তিনি রওনা দিলেন এক অজানা যাত্রায়।
তিনি দেশ ছাড়লেন।
কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন ছাড়লেন না।
আর সেই যাত্রাই তাঁকে পরিণত করবে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক আন্তর্জাতিক নেতায়।
ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা দেখি—
রাসবিহারী বসুর জীবনও যেন এক রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস।
একটি এমন গল্প, যা পড়লে বারবার মনে পড়ে যায় শরৎচন্দ্রের অমর সৃষ্টি—সব্যসাচীর কথা।
আপনাদের কি মনে আছে “পথের দাবী”-র সেই বিখ্যাত দৃশ্য?
যেখানে সব্যসাচী গিরিশ মহাপাত্রের ছদ্মবেশে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বেরিয়ে যায়?
পুলিশ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তবু তারা চিনতে পারে না।
যেন মানুষ নয়, এক ছায়া।
এক রহস্য।
বাস্তবের রাসবিহারী বসুকেও অনেকটা সেরকমই মনে হয়।
ব্রিটিশ সরকার তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করেছিল।
সর্বত্র তাঁর ছবি পাঠানো হয়েছিল।
গোয়েন্দারা দিনরাত তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল।
স্টেশন, রাস্তা, হোটেল, সরকারি দপ্তর—
সব জায়গায় ছিল কড়া নজরদারি।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো—
তারা তাঁকে খুঁজে বেড়াত,
কিন্তু ধরতে পারত না।
তিনি যেন কখনও এক পরিচয়ে থাকতেন না।
কখনও সরকারি কর্মচারী।
কখনও সাধারণ ভদ্রলোক।
কখনও ব্যবসায়ী।
কখনও পথিক।
নতুন পরিচয়।
নতুন চেহারা।
নতুন কৌশল।
আর প্রতিবারই পুলিশের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতেন।
অনেক সময় তো এমনও ঘটেছে—
ব্রিটিশ অফিসারদের একেবারে কাছাকাছি থেকেও তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
এই কারণেই বহু গবেষক মনে করেন, শরৎচন্দ্রের সব্যসাচী চরিত্রের মধ্যে হয়তো বাস্তবের রাসবিহারী বসুর কিছু প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।
যদিও শরৎচন্দ্র কখনও তা সরাসরি স্বীকার করেননি।
আরও একটি আশ্চর্য মিল আছে।
“পথের দাবী”-তে আমরা দেখি—
সব্যসাচীর যাত্রা পৌঁছে যায় রেঙ্গুনে।
ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে বসেও সে স্বাধীনতার স্বপ্নকে জিইয়ে রাখে।
অন্যদিকে বাস্তবের রাসবিহারী বসুও বুঝেছিলেন—
ভারতের মাটিতে তাঁর পক্ষে আর বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।
চারদিকে পুলিশের জাল ক্রমশ শক্ত হয়ে আসছে।
যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার।
যেকোনো মুহূর্তে ফাঁসি।
কিন্তু তিনি জানতেন—
বিপ্লবী ধরা পড়তে পারে।
স্বপ্ন ধরা পড়তে পারে না।
তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বিদেশে যাওয়ার।
সব্যসাচীর গন্তব্য ছিল রেঙ্গুন।
রাসবিহারীর গন্তব্য জাপান।
পথ আলাদা।
দেশ আলাদা।
কিন্তু লক্ষ্য?
একটাই।
ভারতের স্বাধীনতা।
হয়তো সেই কারণেই আজও যখন আমরা উত্তম কুমারের অভিনয়ে সব্যসাচীকে দেখি, কিংবা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের পাতা উল্টাই, তখন মনে প্রশ্ন জাগে—
এ কি শুধুই কল্পনার চরিত্র?
নাকি তার আড়ালে কোথাও লুকিয়ে আছে বাস্তবের এক অধরা বিপ্লবীর ছায়া?
ইতিহাস তার নির্দিষ্ট উত্তর দেয় না।
কিন্তু রাসবিহারী বসুর জীবন আমাদের একটি কথা নিশ্চিতভাবে শেখায়—
কখনও কখনও বাস্তব এতটাই অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে যে কল্পনাকেও হার মানায়।
(চলবে…)
বন্ধুরা, আজ এখানেই ইতি — আবার দেখা হবে পরবর্তী অধ্যায়ে…